চলুন ঘুরে আসি বগুড়ার ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদ থেকে

ছবি- কামরুল হাসান
বাংলাদেশের অন্যান্য জেলাগুলোর মতো নিজস্ব ইতিহাস আর ঐতিহ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি জেলা বগুড়া। ১২ টি উপজেলা নিয়ে বগুড়া জেলা গঠিত। বগুড়ার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় রয়েছে ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থাপনা। তার মধ্যে শেরপুর অন্যতম।
শেরপুর শহরটি করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে এবং বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। শেরপুর নামটি আজ থেকে প্রায় চারশত বছর আগে ইতিহাসের পাতায় স্থানলাভ করে। তার আগে এর নাম কি ছিল তার সম্বন্ধে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে শেরপুর এক সময় উত্তবঙ্গের দিল্লি হিসিবে অভিহিত করা হতো। শেরপুরের প্রাচীনত্ত পুরাতন দিল্লি অপেক্ষা কোন অংশেই কম ছিল না।
আজ আপনাদেরকে জানাবো বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা খেরুয়া মসজিদ সম্পর্কে। খেরুয়া মসজিদের অবস্থান শেরপুর শহর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে।
ইতিহাসবিদ অধক্ষ্য মুহম্মদ রোস্তম আলীর ”শেরপুরের ইতিহাস” বইয়ে খেরুয়া মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সমূহের উল্লেখ রয়েছে।
খেরুয়া মসজিদটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে যথাক্রমে ৩৮ ও ১৬ হাত। মসজিদটি বেশ স্থুলকায় এবং গঠন গাঁথুনি অতীব দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত হওয়ায় অতীতে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের প্রচন্ডতা সত্ত্বেও সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি।
বাগের হাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও শাহজাদপুরে অবস্থিত প্রাচীন মসজিদটির সাথে খেরুয়া মসজিদের হুবহু সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়। খেরুয়া মসজিদের নামকরণ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, জনৈক ফকির আবদুস সামাদ মসজিদটি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
মসজিদে সংস্থাপিত ফার্সি ভাষায় লিখিত শিলালিপি থেকে জানা যায় নবাব মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোশকতায় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।নবাব মির্জা মুরাদ খান ছিলেন তৎকালীন সময়ে এই প্রদেশের জনৈক শ্রেষ্ঠ পাঠান জাগীরদার।
৯৮৯ হিজরী সালের ২৫শে জিলহাজ মাসের সোমবারের দিন (২০ জানুয়ারী ১৫৮২ ঈসায়ী) প্রস্তাবিদ মসজিদটির নির্মাণ স্থান পরিদর্শন করা হয়।
নবাব মির্জা মুরাদ খানের সহযোগিতায় মসজিদটির নির্মাণ কাজ বর্তমান সময়ে সাল অনুসারে ২৬ তারিখের মংগলবারের দিন আরম্ভ হয়।
মসজিদ গাত্রে স্থাপিত শিলা লিপিটি যেন এক ঐতিহাসিক দর্পন। এই দর্পনে তদানীন্তন বঙ্গভূমি ও মুঘল সাম্রাজ্যের চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। কষ্টি পাথর তুল্য কৃষ্ণ শিলায় উৎকীর্ণ হরফগুলো তখনকার লিপিকারদের অনন্য দক্ষতা প্রমাণ করে। সুবিন্যস্ত ফার্সি ভাষায় নোকতা বিহীন হরফ ও শব্দগুলো এমন আলংকারিক ও নৈপুণ্যের সহিত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যা সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তবে ফার্সি ভাষায় লেখা এই শিলালিপির পাঠোদ্ধার ছিল খুবই দুষ্কর। Dr. Paul Horn – Epigraphia India voll 02 গ্রন্থের ২৮৮ পৃষ্ঠায় সর্বপ্রথম ঐ শিলালিপির ছাপ প্রত্যক্ষ করে পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেন, কিন্তু পাঠের মূলকথা অস্পষ্ট থেকে যায়। পরিশেষে, ১৯৩৮ ঈসায়ী সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ জনাব শামস উদ্দিন এম,এ শিলালিপিটির সঠিক পাঠোদ্ধার করেন।
খেরুয়া মসজিদটি একটি অমূল্য পুরাকীর্তি। এটি জীবন্ত ইতিহাসের পটভূমিকা তুল্য প্রাচীন স্থাপত্য শিল্প। তদানীন্তন সময়ে এক ধ্বংসলীলার পর প্রায় আড়াইশ বছর যাবত মসজিদটি অনাবাদ ছিল। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কতৃক মেরামত হওয়ার পর পুনরায় এখানে নিয়মিত নামাজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
১৯৮৮ সাল থেকে মসজিদ এবং এর ৪৮ শতক জায়গা দেখাশোনার জন্য একজন লোক নিয়োগ দেওয়া হয় এখানে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক, স্থাপত্যবিদ, দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন ঐতিহাসিক এই মসজিদটি। মাঝে মাঝে বিদেশী পর্যটক ও গবেষকদের দেখা মেলে।
খেরুয়া মসজিদ থেকে আসার সময় সংগ্রহ করতে পারেন ‘শেরপুরের ইতিহাস’ নামক বইটি। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ রুস্তম আলী বইটিতে তুলে ধরেছেন শেরপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে। বইটির মূল্য ১৫০ টাকা। খেরুয়া মসজিদ থেকে খুব সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন মূল্যবান এই বইটি।
আজকের শেরপুর, এক মহানগরীর স্মৃতি বিজড়িত একটি পরিত্যক্ত খন্ড উপশহর মাত্র। পূর্বে এটি ছিল মানুষ আর ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ এক বিশাল নগরী। অতীতে এ জনপদের প্রশংসায় মুখরিত ছিল সমগ্র বঙ্গভূমি। এ নগরীর খোশ নাম ছড়িয়ে পড়েছিল পাকিস্তান-ভারত বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে, দক্ষিণ ভারতের মালয় সহ দূর দুরান্তের দেশে।
এমনকি পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তেও শেরপুরের পাশ দিয়ে বয়ে চলছে আজকের ক্ষীণ স্রোতা করতোয়া নদী, কিন্তু আদিতে ছিল এটি করস্রোতা।
বর্তমান সময়ের আজকের শেরপুর অপেক্ষা প্রাগৈতিহাসিক শেরপুর ছিল সর্বাধিক সুপ্রসিদ্ধ। নাম করনের পূর্বেও এ স্থানটি তার নিজস্ব মহিমায় ছিল মূর্তমান।
শেরপুর উপজেলায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার রয়েছে আরও রয়েছে প্রায় ২৫০ বছরের দই শিল্প। শেরপুর উপজেলায় প্রথম দই তৈরি শুরু হয় এবং ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে বগুড়া জেলার অন্যান্য জায়গায়। দই এর জন্য বগুড়া জেলা শুধু দেশেই নয় সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধ।
আমাদের দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রচারণার মাধ্যমে এসকল ঐতিহাসিক স্থাপনা তথা দর্শনীয় স্থানগুলোকে তুলে ধরলে সারা বিশ্বের মাঝে পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে।
ফলে পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি এখাতে তৈরি হবে অসংখ্য নতুন কর্মসংস্থান। যা দেশের সামগ্রিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে অসাধারণ ভাবে। দেশের পর্যটন শিল্পকে ই-কমার্সের মাধ্যমে সারা বিশ্বের কাছে যথাযথ ভাবে তুলে ধরতে হবে।পর্যটন শিল্পে তৈরি করতে হবে নতুন নতুন উদ্যোক্তা এবং পর্যটন বান্ধব পরিবেশ।
যেভাবে আসবেনঃ-
বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে খুব সহজে বাস অথবা ট্রেন যোগে বগুড়া আসা যায়। বগুড়া জেলাশহর থেকে বাস অথবা সিএনজি যোগে চলে আসা আয় শেরপুর উপজেলায়। শেরপুর ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সাথেই অবস্থিত। শেরপুর শহর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে খেরুয়া মসজিদ অবস্থিত।
শেরপুর শহর থেকে পায়ে হেঁটে অথবা রিক্সা/ অটোরিকশা করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চলে আসা যায় খেরুয়া মসজিদে।
ঢাকা থেকে যাত্রা করলে প্রথমে শেরপুর উপজেলা এবং তারপর বগুড়া জেলাশহর পড়বে। শেরপুর উপজেলা শহর থেকে বগুড়া জেলাশহরের দূরত্ব প্রায় ২০ কি.মি।

Leave a Comment

Your email address will not be published.