তুরস্কে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) সমাধিতে একদিন

তুরস্কে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) সমাধিতে লেখক আমান উল্লাহ ভুঁইয়া রাজীব।

তুরস্কের লম্বা সফরে অনেক দর্শনীয় ও পবিত্রস্থানে গেলেও আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) সমাধিতে ভালোলাগার অনুভূতি মনে থাকবে আজীবন। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)। ইসলামের অন্যতম বীরযোদ্ধা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যুদ্ধ করেছেন ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের জন্য। অংশ নিয়েছিলেন ঐতিহাসিক সব যুদ্ধে। এর চেয়েও বড় পরিচয়, তিনি ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি। নবীজীর (সা.) অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। তিনি সেই সৌভাগ্যবান সাহাবি, হিজরতের পর মদিনায় যার বাসায় মেহমান ছিলেন নবীজী (সা.)।

শাওয়াল মাসে ৬টি নফল রোজা রাখার সহি হাদিসটি তার কাছ থেকেই পাওয়া। তিনি ১৫০টি হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। মদিনার বনু নাজ্জার বংশোদ্ভূত আবু আইয়ুব আনসারির শেষ আশ্রয় হয়েছিল তুরস্কের ঐতিহাসিক শহর ইস্তাম্বুলে। তুরস্কে তিনি পরিচিত আয়ুপ সুলতান নামে।

তুরস্ক সফরে বাস থামে মাজারের পেছনের অংশের পার্কিংয়ে আমরা ঢুকলাম সে পথ দিয়ে। পাথরের টাইলস বসানো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। চারপাশসহ পাহাড় টিলার ওপর পর্যন্ত পাথরে বাঁধানো শত শত নতুন-পুরোনো সমাধি। মহনবীর (সা.) সহচরের কাছাকাছি দাফনের আগ্রহ জানানো ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অনেক শাসক ও পরিবারের সদস্য এবং কর্তাব্যক্তি এখানে সমাহিত। সেই ধারায় বর্তমান তুরস্কের জনপ্রতিনিধি, বিচারক, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের অনেকে শায়িত ইস্তাম্বুলের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম এ কবরস্থানে।

প্রতিটি সমাধির মাথায় প্রস্তরফলকে তুরস্ক ও আরবিতে লেখা মৃতব্যক্তির জীবনের গল্প। আগে দেখিনি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল এত সুন্দর ও শৈল্পিক হতে পারে। মার্বেল পাথরের গাঁথুনির অনেক উঁচু দরজা পার হয়ে ভেতরের চত্বরে ঢুকলাম। বর্গাকার চত্বরের একদিকে আয়ুপ সুলতান মসজিদ, বিপরীত দিকে হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) মাজার। চত্বরের মাঝখানে লোহার ঘেরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ। চত্বরজুড়ে স্থানীয়সহ বিশ্বের নানা জায়গার পুণ্যার্থীদের জটলা। সপ্তাহান্তে এবং ধর্মীয় ছুটির দিনে লোকে লোকারণ্য থাকে, ছুটি না থাকায় নিরিবিলি পরিবেশ পেলাম আমরা।

জিয়ারতের জন্য দু’রাকাত নফল নামাজ পড়তে প্রথমে ঢুকলাম মসজিদে। ভেতরের পুরো চত্বরজুড়ে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী গালিচা, দৃষ্টিনন্দন বিশাল ঝাড়বাতি, কারুকাজের গম্বুজ ও মিম্বার-অটোমন স্থাপত্যশিল্পের প্রতিচ্ছবি। পুণ্যার্থীদের কেউ নামাজে, কেউ তেলাওয়াতে মগ্ন। নামাজ শেষে গেলাম সমাধির দিকে। মসজিদের টাইলসগুলো তুরস্কের বাইরেও বেশ কিছু জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে, সম্ভবত ১৭৬৬ সালে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রবেশ কক্ষ থেকে গোসলখানা পর্যন্ত দেয়ালগুলো একসময় এসবে ঢাকা ছিল।

বাইরে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করছেন অনেকে। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ছোট পরিসরের সমাধিকক্ষ, বিভিন্ন শতাব্দীর শিল্পিত লিপি, স্বচ্ছ ঝাড়বাতি এবং রূপালি কারুকাজে সাজানো। চকচকে রঙিন টাইলসে মোড়ানো চারদিকের দেয়ালের সাথে রং আর দ্যুতিতে জ্বলজ্বল করছে কবরের প্রকোষ্ঠ। দেয়ালের নানা জায়গায় পবিত্র কোরআনের বাণীর চমৎকার ক্যালিওগ্রাফি। একপাশের দেয়ালে রূপালি ফ্রেমের বাক্সের ভেতর রাখা আছে মার্বেল পাথরের গায়ে খচিত মহানবীর (সা.) পায়ের ছাপসহ কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র। জানা যায়, অটোমেন যুগের প্রতিটি প্রজন্মের শাসক এবং অনেক দানশীল ব্যক্তি এই সমাধির অলংকরণ আর সৌন্দর্য বাড়াতে কাজ করেন।

রূপালি লিপিখচিত পাথরের সমাধির সামনে জেয়ারতে মগ্ন পুণ্যার্থীরা, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে। নিচুস্বরে তেলওয়াত করছেন কয়েকজন। একবারে শান্ত পরিবেশ। নবীজীর ঘনিষ্ঠ সহচরের এত কাছে, জিয়ারতের সময় অন্যধরনের অনুভূতি হলো আমার। প্রশান্তিতে ভরে গেল মন-প্রাণ। তার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া শেষে বেরিয়ে আসলাম।

অটোমেন সুলতানদের সিংহাসনে আরোহণের উৎসবস্থল ছিল এই পবিত্র জায়গাটি। এখানেই নতুন সুলতানদের ওসমানীয় তলোয়ার দিয়ে বরণ করে নেওয়া হতো। অভিযান বা যুদ্ধে যাওয়ার আগে এখানেই সুলতানরা তাদের তরবারি শক্ত হাতে তুলে ধরার রেওয়াজ ছিল। আর এখন এই পবিত্র জায়গায় এসে দোয়া করে সংসার জীবন শুরু করাকে অত্যন্ত বরকতময় মনে করেন তুরস্কের নবদম্পতিরা। আরও রেওয়াজ আছে সুন্নতে খতনা করা তুর্কি বালকদের এখানে এসে দোয়া করার।

এরপর ঘুরে দেখলাম আশপাশ। মসজিদের পাশেই গাছ-গাছালি আর ফুলে ভরপুর সবুজ বাগানের মাঝে রান্নাঘর। অটোমেন সুলতান দ্বিতীয় মেহমুতের সময় এখানে বিশাল চুলা আর পাত্রে রান্না করা হতো, বিধবা, বৃদ্ধ এবং এতিমদের বিনামূল্যে খাওয়ানোর জন্য।

  • আমান উল্লাহ ভুঁইয়া রাজীব, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড। 

Leave a Comment

Your email address will not be published.