একাকীত্ব, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন, চাকরি হারানো, ঠিকমতো বেতন না পাওয়াসহ সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা মানসিকভাবে নানা সংকটের সম্মুখীন হন। দেশে ফেরার পরে অনেকের এই সংকট ভিন্ন মাত্রা পায়। বিশেষ করে যারা ব্যর্থ হয়ে বা অনেকদিন পর দেশে ফেরেন, তাদের এই সংকট বেশি।
পুরুষের চেয়ে নারীদের সংকট আবার জটিল। সংকট সমাধানে অভিবাসী কর্মী ও বিদেশ-ফেরতদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কাউন্সেলিং পেলে তারা দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারেন। কিন্তু দেশে কাউন্সেলিং ও মনোচিকিৎসক সংকটের কারণে সেই সেবা পর্যাপ্ত মেলে না।
অভিবাসী ও বিদেশ-ফেরত অভিবাসীদের মনোসামাজিক সংকট নিয়ে করা ব্র্যাকের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য বলছে, বিদেশ-ফেরতদের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে সাদৃশ্যপূর্ণ লক্ষ্মণগুলো পাওয়া গেছে তা হলো— বিরক্তি, অসহায়ত্ব, ট্রমা, আত্মঘাতী আচরণ, ঘুমের সমস্যা, রাগ, বিধ্বস্ত অনুভূতি, মন খারাপ, মনের মধ্যে ফাঁকা অনুভূতি হওয়া, মানসিক চাপ, হতাশা, উদ্বেগ, অপরাধবোধ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, নেতিবাচক মন্তব্যের ভয় এবং মানুষের প্রতি অবিশ্বাস।
গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, মনোসামাজিক সহায়তা পাওয়ার পরে বিদেশ-ফেরতরা নিজেদের মানসিক স্থিতি রক্ষা করতে নিজস্ব কৌশল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে আত্মপ্রেরণার মাধ্যমে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া, নেতিবাচক মন্তব্য উপেক্ষা করা, জীবনসঙ্গীর ওপর নির্ভর করা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা, দৈনন্দিন কাজে সক্রিয় থাকা, পরিবারের মন্তব্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবন্ধকতাগুলো মেনে নেওয়া এবং কষ্টদায়ক স্মৃতিগুলো পুনরায় মনে না করা।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে কাউন্সেলিং সেবা প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ বা সুবিধা অনুপস্থিত অথবা অপর্যাপ্ত। এছাড়া, দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর অভাব এবং বিশেষত বিদেশ-ফেরত বা অভিবাসী শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকার কারণে পিএসএস কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন-
আমরা বিদেশ-ফেরতদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি একাকীত্ব, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন, চাকরি হারানো, ঠিকমতো বেতন না পাওয়াসহ সুনির্দিষ্ট কতোগুলো কারণে অভিবাসীরা মানসিক সংকটে পড়েন। কিন্তু বাংলাদেশের অন্য সবার মতো প্রবাসীরাও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেন না। তবে আমরা দেখেছি— যারা কাউন্সেলিং সেবা নিয়েছেন বা পেয়েছেন, তারা দ্রুত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। বিশেষত নারীরা পুরুষদের চেয়েও দ্রুত সুস্থ হয়েছেন।
নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন ওমান ও সৌদি আরব ফেরত দুইজন প্রবাসী। গন্তব্য দেশে প্রতারণা ও নির্যাতনের কারণে তাদের যে নানা মানসিক সংকটে ভুগতে হয়েছে সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এক নারী বলেন,
আমাদের কথা তো কেউ শোনে না। ব্র্যাকের কাউন্সেলররাই প্রথম আমাদের কথা সময় নিয়ে শুনেছেন। তারা আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন কীভাবে সুস্থ থাকতে হবে। তাদের কাছ থেকে মনোসামাজিক সহায়তা পেয়ে আমরা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি।
মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশ থেকে ফেরা ১ হাজার ৯৬ জন বিদেশফেরত কর্মীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, তাদের মধ্যে
দেশে ফিরে বিভিন্ন সেবা নিয়েছেন ১ হাজার ৮৩০ জন প্রবাসী কর্মী। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বা ১ হাজার ৯৬ জন এসেছেন স্বাস্থ্যসেবা নিতে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ এসেছেন মানসিক সমস্যা নিয়ে। যাঁরা এসেছেন, তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশ নারী এবং ৩৯ শতাংশ পুরুষ। নারী বেশি এলেও তাঁদের চেয়ে পুরুষ কর্মীরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে বেশি এসেছেন। মানসিক সমস্যা নিয়ে যাঁরা এসেছেন, তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ পুরুষ।
কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জরিপের তথ্য সংগ্রহ করেছে তৃণমূল অভিবাসীদের সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)।