রাঙ্গামাটি শহর থেকে একটা নৌকায় করে অপরূপ কাপ্তাই লেকের ভেতর দিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট যাবার পর আমরা যখন আমরা যখন দ্বীপটাতে পৌছালাম তখন দুপুর। চারিদিকে লেকের শান্ত জলরাশি। একদল মানুষ পিকনিক করতে এসেছে। তাদের হৈহুল্লোরে মুখর দ্বীপটি। ‘অপ্সরী’ নামের একটা কটেজে উঠলাম আমরা। কটেজের ভেতরে প্রবেশ করে আমরা মুগ্ধ। আমি ইতালির সরেন্তোতে এমন একটা ছোট্ট কটেজে ছিলাম। মিষ্টি কটেজটা আমাদের মন কেড়ে নিলো। বিছানার পাশের জানালাটা খুলতেই পুরো কাপ্তাই লেক যেন আমাদের হাসিমুখে স্বাগত জানালো।

বিকেলের দিকটাতে পিকনিকের লোকজন চলে গেলো। দূরে রাঙ্গামাটি শহরের ওপাশে ফুরোমন পাহাড়ের উপর দিয়ে দিনের পাট চুকিয়ে বিদায় নেবার প্রস্তুতি শুরু করে দিলো সূর্য। আমরা তখন জুমঘর কটেজের বারান্দায় বসে প্রকৃতির এই অনাবিল চিত্রকর্ম দেখছি। লেকের এদিক-ওদিক দিয়ে নৌকার চলাচলের দৃশ্যগুলো যেন পটে আঁকা চলমান ছবি।
রাত নেমে এলে মায়াবী দ্বীপটা যেন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। দ্বীপের রান্নাঘরে তখন স্থানীয় পাহাড়ি রান্নার প্রস্তুতি চলছে। আমরা গিয়ে তাদের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। চোখের সামনেই সবকিছু রান্না হলো। আমাদের জন্য আলাদা করে টেবিল পাতা হলো। শহরের কোলাহল থেকে দূরে একটা নির্ভেজাল প্রকৃতির মধ্যে বসে আমরা রাতের খাবার খেলাম। দ্বীপটার পাশ ঘেঁষে কিছু নৌকা দেখলাম। সেগুলো থেকে মাছ ধরার জাল ফেলা হয়েছে লেকের ভেতর। প্রকৃতি ও জীবনের যেন এক জীবন্ত প্রদর্শনী।
এর মধ্যে কিছু রোমাঞ্চপ্রিয় তরুণ এসেছে। তারা এই মায়াবী দ্বীপে তাবুবাস করবে। তাঁবুগুলো খাটানোর পর তারা দ্বীপের একপাশে শেষ সীমানায় লেকের পানির কাছে গিয়ে ক্যাম্প ফায়ার করলো। তারপর শুরু হলো বার-বি-কিউ এর প্রস্তুতি। অনেক রাত পর্যন্ত চললো তাদের এসব আয়োজন। জানতে পারলাম, এই মায়াবী দ্বীপে যোগাযোগ করলে তারাই এসব তাঁবুর ব্যবস্থা করে দেয়। সাথে ক্যাম্প ফায়ার বা বার-বি-কিউ এর আয়োজনও তারাই করে দেয়।

চমৎকার একটা ঘুম হলো রাতে। সকালের রূপটা আমরা মিস করতে চাইনি। তাই অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। বহু নাম জানা অজানা পাখির কলকাকলিতে তখন মুখর মায়াবী দ্বীপ। একটা অনাবিল সূর্যদয় তখন আমাদের অপেক্ষায় ছিল। আমরা গাছের সাথে ঝুলানো দোলনায় দোল খেতে খেতে, লেকের দিকে মুখ করা চেয়ারে বসে হেলান দিয়ে চা খেতে খেতে রূপবতী সূর্যের আগমন দেখলাম পৃথিবীতে।
লেকের জলরাশির অপারে যে পাহাড় তার ভেতর থেকে যেন বেড়িয়ে এলো একটা আনকোড়া সূর্য। পুরো কাপ্তাই লেক জুড়ে তার সোনালী আভা ছড়িয়ে গেলো।আহা সে কী রূপ! এরই মধ্যে ঢেউ কেটে কেটে নৌকাগুলো চলাচল শুরু করলো। মনে হচ্ছিলো যেন অনন্তকাল তাকিয়ে থাকি।
আমাদের সকালের নাস্তা প্রস্তুত হয়ে গেলো। ডিম মামলেট আর খিচুড়ি। সাধারণেই কী অসাধারণ বিলাসিতা জীবনের।
সকালেই এসে হাজির হলেন সাংবাদিক ফজলে এলাহি ভাই। সে আমার বহু পুরনো বন্ধু। রাঙ্গামাটি মানেই আমার কাছে এলাহি ভাই।

এই মায়াবী দ্বীপ সে সহ তাদের মোট ১০০ জন বন্ধুর মিলিত একতা স্বপ্নের বাস্তবায়ন। বছর দশেক আগে থেকে তারা এই স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল। প্রতি মাসে খুব অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে তারপর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তারা। এই মায়াবী দ্বীপ নিয়ে এলাহি ভাই তাদের বন্ধুদের স্বপ্নের কথা জানালেন। বললেন- রাঙ্গামাটির পাহাড়ের সৌন্দর্য, লেকের সৌন্দর্য আর প্রকৃতির নির্জনতা সবকিছু যেন মানুষ একটা জায়গা থেকেই উপভোগ করতে পারে, মানুষের জন্য তেমন একটি গন্তব্য তৈরি করারই স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। ভবিষ্যতেও তারা মায়াবী দ্বীপটাকে তারা এমন মায়াবীই রাখতে চান।
তারপর আমাদের বিদায়ের সময় হয়ে এলো। নৌকা ছেড়ে দিলো। দ্বীপটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। বেঁচে থাকলে ভরা বর্ষায় আসবো। পাহাড়জুড়ে, কাপ্তাই লেকজুড়ে যখন ঝুম বৃষ্টি নামবে তখন…
২ Responses
রাঙ্গামাটির কোল ঘেঁষে পাহাড় ও কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্যে ঘেরা এক অনিন্দ্য সুন্দর স্থান হলো ‘মায়াবী দ্বীপ’। এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক স্বপ্নীল গন্তব্য, যেখানে কাপ্তাই হ্রদের নির্মল জলরাশি আর সবুজ পাহাড় একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে অপূর্ব এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
‘মায়াবী দ্বীপ’-এ যাওয়া হয়েছে আমারও। কিন্তু আপনার মতো করে রোমান্টিক মুডে দেখার সুযোগ হয়নি। পরেরবার নিশ্চয়… 🙂