শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

২০ হাজার টাকা দিলাম, রাতের মধ্যে এক লাখ টাকা হয়ে গেলো

কাজ করতে আমার একদম ভাল্লাগে না। এমন কোন উপায় যদি পেতাম যে, শুয়ে শুয়ে থাকবো আর লাখ লাখ টাকা উপার্জন করবো। এমন কোন উপায় কী আছে? যদি থাকে তাহলে বুদ্ধিটা আমাকে দিন। আর এই ফাঁকে আমরা সৌদি প্রবাসী এক ভাই এর শুয়ে শুয়ে টাকা উপার্জনের গল্প শুনে আসি।

আসসালামু আলাইকুম। আমি সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে থাকি। ২০২০ সালে ২৩শে জানুয়ারি আমি সৌদি আরবে আসি। তখন আমার কাজকাম মিলিয়ে সবকিছুই ভালোই ছিল। হালাল ইনকাম করতাম, খুব ভালো ছিলাম। আমার ফ্যামিলিতে কোন টানাপোড়েন ছিল না। আমার বড় ভাই চাকরি করতো। তাই পরিবার চালানোর জন্য আমার টাকার উপর নির্ভর করতে হতো না। তাই, আমার উপার্জনের প্রায় সব টাকাই সঞ্চয় করতে পারতাম।
ঢাকাতে আমাদের নিজস্ব বাড়ি ছিল। কোন বিষয় নিয়ে তেমন কোন টেনশন ছিল না। আমার জীবনটা খুবই সুন্দর ছিল। কাজ করে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার, এমনকি ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমি দেশে পাঠিয়েছি। সেসব আমার সুখের দিন।

২০২৩ সালে ১৬ এপ্রিল আমি বাংলাদেশে যাই। আমি মনে করি- আমার জীবনের সবচাইতে বড় ভুল ছিল ঐ ছুটিতে যাওয়া। আমার এক বন্ধু ছিল- তার নাম সাইফুল। সে আমার খুব কাছের বন্ধু। একদিন বিকেলে আমি আমার ভাইয়ার বাইকে করে সাইফুলকে নিয়ে ঘুরতে যাই খুব দামী একটা রেস্টুরেন্টে। আমি খুব অবাক হয়ে দেখলাম ওর হাতে আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স। খাওয়ার পর আমাদের বিল হয় সাড়ে চার হাজার টাকা। সেই বিলটাও সাইফুলই দিয়ে দিলো।

আমি এসব দেখে কেবলই অবাক হতে থাকি। কারণ আমি জানি তার বাবা ভ্যানগাড়ি চালাতো এবং সাইফুলের অবস্থাও তেমন স্বচ্ছল ছিল না। সে একটা রোলিং মিলে কাজ করে যেখানে তার বেতন মাত্র ১২ হাজার টাকা। আমি অবাক হয়েই ওকে জিজ্ঞেস করলাম- তুই যে টাকা বেতন পাস তা দিয়ে তোর পরিবার কিভাবে চালাস? আর এত বিলাসিতাই বা করিস কীভাবে!

ও আমাকে বললো- তুই বিদেশ বইসা যেই টাকা কামাস, আমি শুইয়া শুইয়া তারচেয়ে বেশি টাকা কামাই। আমি খুব অবাক হয়ে বললাম- তুই শুয়ে শুয়ে কিভাবে টাকা কামাস। ও তখন আমাকে বলে- 1xbet এর কথা। আমি একদমই আগ্রহী ছিলাম না ওর কথায়। কারণ, আমি শুরু থেকেই হালাল ইনকাম করতাম এবং আমি খুব সন্তুষ্ট ছিলাম।

ঠিক তার কিছুদিন পরেই বোনের গায়ে হলুদ উপলক্ষ্যে ওর বাসায় আমাদের দাওয়াত দেয়। সেই রাতে আমি ওদের বাসাতেই থাকি এবং আমরা একসাথেই ঘুমাই। তখন ও আমাকে বললো- তোর বিকাশে কি ২০ হাজার টাকা আছে? আমি বললাম- হ্যাঁ আছে। তখন ও আমার মোবাইলে 1xbet একাউন্ট খুলে আমার সামনেই বিশ হাজার টাকা ডিপোজিট করে। তারপর ঐ রাতের মধ্যেই আমাকে এক লাখ টাকা উইথড্র করে দিলো।

আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। টাকা বানানো এত সহজ! ও একটা গেম খেলতো। সেটার নাম হচ্ছে ক্রাশ বা অ্যাবিউটর। দেখতে খুবই সহজ কিন্তু এটাই হচ্ছে মরণ ফাঁদ। আপনি যত টাকা লাগাবেন, ক্যাশআউট করলেই তত টাকা পেয়ে যাবেন। আমি ওটা দেখে ভাবলাম- এটা তো খুবই সহজ। আমি তো এটাতে কোনদিন লস খাব না। তারপর থেকে আমার জীবনে ধ্বংস হওয়া শুরু হলো এবং কি যে আমাকে শিখিয়েছে, সেও এখন ধ্বংস হয়ে গেছে। সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুমায়।

আমি এরই মধ্যে আমার জমানো এগারো লাখ টাকা নষ্ট করেছি। আমি বাংলাদেশে যাওয়ার পর এই টাকা নষ্ট করার পরও, মা-বাবার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে, সেটাও এভাবে নষ্ট করেছি। তখন আমি পাগলের মত হয়ে গেলাম। আমার মাথায় কোন কিছুই কাজ করছিল না। টাকা দেখলেই আমার মনে হচ্ছিল, আমি এখনই ডিপোজিট করে এখনই সেই টাকা ব্যাক পাবো।

এমন অবস্থার মধ্যেই আমি আবার সৌদি আরবে ব্যাক করি। তারপর থেকে আমার জীবনে আরও বড় বড় বিপদ আসা শুরু হলো। আমি নিজেকে কোনভাবেই কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। টাকা দেখলেই আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ওই টাকাটা কোথা থেকে আসলো, কার থেকে আসলো- সেটা আমার মাথায় কোন কিছুই কাজ করছিল না।

এভাবে একদিন আমার কোম্পানির দশ হাজার রিয়াল এক রাতে ডিপোজিট করে ফেলি। সেই টাকা হারার পর আমি বুঝতে পারছিলাম না, এখন আমি কী করবো! আমি অনেকবার নিজের জীবন নিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। পরে আমি সকালবেলা আমার ভাইয়াকে কল দিয়ে বিপদের কথা জানাই। তাকে বলি যে- অনেক বড় বিপদে পড়েছি। টাকা যদি না পাই তাহলে পুলিশ আমাকে ধরে পাঠিয়ে দিবে। অনেক মিথ্যা কথা বলে অর্ধেক দিনের মধ্যে আমি টাকাটা ম্যানেজ করে নিয়েছি। আমার মা-বাবা মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে আমাকে সেদিন বাংলাদেশি সাড়ে তিন লাখ টাকা দেয়।
তখন আমার মনে হচ্ছিল এই টাকা দিয়ে আবার আমি ডাবল করে কোম্পানিকে দিয়ে বাকি টাকা বাসায় ফেরত দিয়ে দেবো। তারপর সেই টাকাও আবার হেরে যাই। আমার মাথায় কোন কিছু কাজ করে না। কোনটা ভালো কোনটা খারাপ, আমার মাথায় কাজ করে না।

এভাবে করতে করতে আমার ঋণের পরিমাণ এখন ৪০ লাখ টাকা। এখন আমি কী করবো জানি না। আমার বেঁচে থাকার মত আর কোন অবস্থা নেই। আমি আপনাদের মাধ্যমে একটাই মেসেজ সবার কাছে দিতে চাই- এই ফাঁদে কেউ পা দিবেন না। দেখতে খুব সহজ সরল আমিও এই গেমের ফাঁদে পড়ে জীবনটা নষ্ট করে দিলাম। এখন আমি আমার জীবনে কোন লক্ষ্য নাই। সবাই আমার কাছ থেকে টাকা পাবে। আমি সবার কাছ থেকে এখন লুকিয়ে বেড়াই।

আহা ৪০ লাখ টাকা যদি আমার থাকতো, তাহলে আমি কথ ভালো ভালো কাজ করতে পারতাম। অনেক মানুষের কয়েক বছরের খাবার জুটে যেতো। যার মাথা গোজার ঠাই নেই, সে সরাসরি দালান বাড়ি করতে পারতো। যার জটিল রোগের চিকিৎসার টাকা নেই, সে সুস্থ হয়ে উঠতে পারতো। কিন্তু আপনি কী করলেন! ৪০ লাখ টাকা হাওয়া করে দিলেন। শুধু একটা কথা মনে রাখুন- আপনি হেরে যান জন্য অন্য কেউ জিতে যায়। ভালো থাকুন। দেখা হবে জীবনের গল্পের ভিন্ন কোন বাঁকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *