বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

শিক্ষার অগ্রগতি, নৈতিকতার অবনতি: দুর্নীতি কেন পিছু হটছে না?

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৭৪.৬৬ শতাংশে। এর মধ্যে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৭৬.৫৬ শতাংশ, আর নারীদের হার ৭২.৮২ শতাংশ। (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ) । প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা—সব স্তরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে স্কুলে যাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট। এই চিত্র নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দুর্নীতি কমছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও সংগঠিত, আরও কৌশলী এবং আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা বাড়লেও দুর্নীতির লাগাম কেন টানা যাচ্ছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আগে ভাবতে হবে—আমরা কেমন শিক্ষা দিচ্ছি এবং সেই শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ডিগ্রি, চাকরি ও আর্থিক সফলতাকেন্দ্রিক। পরীক্ষায় ভালো ফল, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কিংবা লাভজনক চাকরি পাওয়াকেই শিক্ষার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু একজন মানুষ সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে কি না—এই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলে সমাজ পাচ্ছে দক্ষ মানুষ, কিন্তু চরিত্রবান মানুষের সংখ্যা আশানুরূপভাবে বাড়ছে না।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষা কখনোই কেবল পুঁথিগত জ্ঞান বা পেশাগত দক্ষতার বিষয় নয়। ইসলাম শিক্ষা বলতে বোঝায় এমন জ্ঞান, যা মানুষের চরিত্রকে শুদ্ধ করে এবং তাকে ন্যায়পরায়ণ করে তোলে।কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দেন আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার কর, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করতে।”(সূরা নিসা: ৫৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দায়িত্ব মানেই আমানত। সরকারি পদ, প্রশাসনিক ক্ষমতা, জনপ্রতিনিধিত্ব কিংবা শিক্ষকতা—সবই আমানত। দুর্নীতি মূলত এই আমানতের খেয়ানত। এ প্রসঙ্গে কুরআনের আরেকটি নির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না এবং জেনে-বুঝে তোমাদের আমানতের খেয়ানত করো না।”(সূরা আনফাল: ২৭)

দুর্নীতির বিস্তারের আরেকটি বড় কারণ হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, ছোট অপরাধে দ্রুত শাস্তি হলেও বড় দুর্নীতির ঘটনাগুলো বছরের পর বছর বিচারহীন থেকে যায়। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে দেয়—ক্ষমতা থাকলে আইনের ভয় নেই। অথচ ইসলামে এই ধারণার কোনো স্থান নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ছিলেন সম্পূর্ণ আপসহীন। তিনি বলেছেন—
“আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমিও তার হাত কেটে দিতাম।” (সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮; সহিহ মুসলিম: ১৬৮৮)

এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয় যে ইসলামে আইন সবার জন্য সমান—দুর্বল ও শক্তিশালী নির্বিশেষে। একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ব্যবহার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও সতর্ক করেছেন—
“যে ব্যক্তি আমাদের ওপর দায়িত্বপ্রাপ্ত হলো এবং সে আমাদের কাছ থেকে কিছু গোপন করল, তা হবে কিয়ামতের দিন তার জন্য খেয়ানত।”(সহিহ মুসলিম: ১৮৩৩)

রাজনীতির ক্ষেত্রেও নৈতিকতার সংকট গভীর। ইসলামে নেতৃত্ব মানে সেবা ও কঠোর জবাবদিহি। অথচ আমাদের বাস্তবতায় রাজনীতি অনেক সময় ক্ষমতা ও সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচন, দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী গড়ে উঠছে, যারা দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করে তুলছে।
কুরআন এ বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছে—
“আর তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকদের কাছে পৌঁছিও না।”(সূরা বাকারা: ১৮৮)
এই আয়াত ঘুষ, কমিশন, টেন্ডারবাজি ও প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতির সরাসরি বিরোধিতা করে। পাশাপাশি কুরআনে আরও বলা হয়েছে—
“মাপে ও ওজনে কম দিও না এবং মানুষের প্রাপ্য হরণ করো না।”(সূরা হূদ: ৮৫)

তবে দুর্নীতির দায় শুধু রাষ্ট্র বা রাজনীতিবিদদের ওপর চাপিয়ে দিলে সত্যের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। সমাজ হিসেবে আমরাও দায়ী। ঘুষ দিয়ে কাজ করানো, অন্যায় দেখেও চুপ থাকা কিংবা ‘এভাবেই চলে’ বলে মেনে নেওয়ার মানসিকতাই দুর্নীতিকে সামাজিক বৈধতা দেয়। অথচ ইসলামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে ঈমানের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“তোমাদের কেউ অন্যায় দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে; যদি না পারে তবে মুখে, আর তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করে—আর এটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।”
(সহিহ মুসলিম: ৪৯)

দুর্নীতি রোধে তাই কেবল শিক্ষার হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, আল্লাহভীতি ও আখিরাতের জবাবদিহির চেতনা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখবে।”(সূরা যিলযাল: ৭–৮)

একজন মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে তাকে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে, তাহলে সে ক্ষমতার অপব্যবহার করার আগে বহুবার ভাববে। কুরআন এই মৌলিক সত্যটি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।”(সূরা রা‘দ: ১১)

শিক্ষা আমাদের দক্ষ করে তুলছে—এটি নিঃসন্দেহে আশার কথা। কিন্তু সেই শিক্ষার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, সততা ও ইসলামি মূল্যবোধ যুক্ত না হয়, তবে সেই শিক্ষাই কখনো কখনো দুর্নীতিকে আরও কৌশলী করে তোলে। তাই আজকের চ্যালেঞ্জ শুধু আরও শিক্ষিত হওয়া নয়; বরং আরও সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠা। এই উপলব্ধি থেকেই একটি দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথ খুঁজে নিতে হবে।

 

  • আসমা আক্তার
    সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
    এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *