বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

সবশেষ

আব্বাসীয় আমলে নারী শিক্ষার গতিপ্রকৃতি ; একটি মানবিক পর্যবেক্ষণ

আব্বাসীয় খিলাফত( ৭৫০- ১২৫৮ খ্রি.) ইসলামী ইতিহাসের একটি স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত, যেখানে জ্ঞান- বিজ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে । এই প্রেক্ষাপটে নারী শিক্ষার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে আমরা একটি জটিল, বহুমাত্রিক ও গতিশীল চিত্র দেখতে পাই — যা কখনো সম্ভাবনাময়, কখনো সীমাবদ্ধ, কিন্তু সর্বদাই শতভাগ মানবিক চেষ্টা, সংগ্রাম ও অর্জনের গল্প বলে ।

গতিপ্রকৃতির মানবিক দিকগুলো

১. বৈপরীত্যের মধ্যেকার অগ্রগতি

আব্বাসীয় সমাজে নারী শিক্ষা একটি বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থানে ছিল । একদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীলতা, অন্যদিকে জ্ঞানার্জনের প্রতি ইসলামের মৌলিক উদ্যোগ । এই টানাপোড়েনের মধ্যেই নারীদের শিক্ষা অগ্রসর হয় । অনেক পরিবারে নারীদের জন্য গৃহশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল, যেখানে তারা কুরআন, হাদিস, ধর্মতত্ত্ব, আরবি ব্যাকরণ, কবিতা ও সাহিত্য শিখতেন ।

২. প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও বিকল্প পথ

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন মাদ্রাসাগুলো মূলত পুরুষকেন্দ্রিক ছিল । কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা নারীদেরকে সম্পূর্ণ নিরক্ষর রাখতে পারেনি । সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারের নারীরা প্রায়ই বাড়িতেই ব্যক্তিগত শিক্ষক নিযুক্ত করে উচ্চশিক্ষা লাভ করতেন । বাগদাদের মতো নগরকেন্দ্রগুলোতে কিছু নারী সাহিত্য, চিকিৎসাবিদ্যা ও দর্শনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন ।

৩. সাধারণ নারী ও অভিজাত নারীদের মধ্যে ব্যবধান

শিক্ষার সুযোগ ছিল অভিজাততান্ত্রিক । রাজপ্রাসাদ, আমির- ওমরাহ ও ধনী বণিক পরিবারের নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি শিক্ষার সুযোগ পেতেন । খলিফা হারুন আল- রশীদের বোন আব্বাসা বিনতে আল- মাহদী, কিংবা আল- মামুনের সময়কার বহু বিদুষী নারী জ্ঞানচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন । অন্যদিকে, সাধারণ নারীরা মূলত গৃহশিক্ষা ও পারিবারিক জ্ঞানবিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন ।

৪. বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের স্বীকৃতি

ঐতিহাসিক রেকর্ডে আব্বাসীয় যুগের কিছু নারী পণ্ডিতের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে । যেমন

· সুতাইতা আল- মাহামিলি( ১০ শতক) – বাগদাদের গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ
· লুবনা কর্ডোবার( ১০ শতক) – আল- হাকাম II- এর দরবারের গ্রন্থাগারিক ও প্রখ্যাত লেখিকা
· ফাতিমা আল- ফিহরি( ৯ শতক) – ফেজে কারাওয়িন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা( যদিও ফাতেমীয়, আব্বাসীয় প্রভাবাধীন)

তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে নারীরা এই যুগে সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে ছিলেন না বরং জ্ঞানচর্চার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন ।

৫. অদৃশ্য শিক্ষার প্রবাহ

প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ডে না থাকলেও, নারীদের মধ্যে মৌখিক জ্ঞানপ্রবাহ, গৃহশিক্ষা, কবিতা- সাহিত্য চর্চা, ধর্মীয় শিক্ষাদান ইত্যাদির মাধ্যমে একটি” অদৃশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি” গড়ে উঠেছিল । মায়েরা সন্তানদের প্রথম শিক্ষক হিসেবে, বিশেষ করে ভাষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন ।

ফলাফল একটি মানবিক মূল্যায়ন

ইতিবাচক দিক

১. ব্যক্তিগত ক্ষমতায়ন শিক্ষিত নারীরা পরিবার ও সমাজে পরোক্ষভাবে প্রভাব রাখতে সক্ষম হতেন ।
২. সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ অনেক নারী সাহিত্য, কবিতা ও ঐতিহ্য রক্ষা ও প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরে ভূমিকা রেখেছেন ।
. ভবিষ্যতের ভিত্তি আব্বাসীয় যুগের নারী শিক্ষার সীমিত চর্চাই পরবর্তী ইসলামী যুগে নারী শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে ।

সীমাবদ্ধতা

১. গণভিত্তিক না হওয়া শিক্ষার সুযোগ সামাজিক শ্রেণিভেদে সীমাবদ্ধ ছিল ।
২. প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব অধিকাংশ নারী পণ্ডিতই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা শিক্ষকতার পদ থেকে বঞ্চিত ছিলেন ।
৩. ঐতিহাসিক উপেক্ষা অনেক নারীর অবদান ইতিহাসে উপযুক্তভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি ।

আব্বাসীয় আমলের নারী শিক্ষার গল্প শুধু পরিসংখ্যান বা প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; এটি মানুষের জ্ঞানপিপাসা, সামাজিক বাধা অতিক্রমের চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের সংগ্রামের গল্প । এটি আমাদের দেখায় যে

· জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা সামাজিক কাঠামো দ্বারা সম্পূর্ণরূপে নিরোধ করা যায় না ।
· শিক্ষা কখনোই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম নয়, এটি একটি মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক প্রক্রিয়া ।
· ইতিহাসের পৃষ্ঠা যাদেরকে কম লিপিবদ্ধ করেছে, তাদের অবদানও ঐতিহাসিক বাস্তবতার অংশ ।

আব্বাসীয় নারীরা তাদের প্রেক্ষাপটে যতটুকু সম্ভব ছিল, ততটুকুই জ্ঞানার্জনের পথ তৈরি করেছিলেন । এই সংগ্রামটি শুধু ইসলামী সভ্যতার নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসেরই একটি অধ্যায় — যেখানে মানবিক জ্ঞানপিপাসা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে গেছে । আব্বাসী আমলে নারী শিক্ষার সূচনা ও বিকাশ পর্বের বিশ্লেষণ

আব্বাসী খিলাফত( ৭৫০- ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) ছিল ইসলামী জ্ঞান- বিজ্ঞানের এক স্বর্ণযুগ । এই যুগে নারী শিক্ষার একটি নির্দিষ্ট পথপরিক্রমা পরিলক্ষিত হয়, যা বিভিন্ন পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে ।

সূচনা পর্ব( প্রথমিক আব্বাসী যুগ ৭৫০- ৮৪৭ খ্রি.)

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

· রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আল- মনসুর, আল- মাহদী, হারুন আল- রশীদ ও আল- মামুনের নেতৃত্বে বাগদাদ জ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়
· বাইতুল হিকমা প্রতিষ্ঠা( ৮৩০ খ্রি.) জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যা পরোক্ষভাবে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ উন্নীত করে
· সামাজিক কাঠামো পারসিক, গ্রিক, ভারতীয় ও অনারব সংস্কৃতির সংমিশ্রণে একটি বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি

নারী শিক্ষার প্রাথমিক রূপ

1. গৃহকেন্দ্রিক শিক্ষা প্রাথমিকভাবে নারী শিক্ষার মূল ক্ষেত্র ছিল পরিবার
· কুরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা মসজিদ বা ঘরে মহিলা শিক্ষিকাদের( মু’আল্লিমা) মাধ্যমে
· ব্যবহারিক শিক্ষা গৃহ ব্যবস্থাপনা, সূচিকর্ম, চিকিৎসা( বিশেষ করে নারী ও শিশু চিকিৎসা)
. অভিজাত পরিবারের সুযোগ
· রাজপরিবার ও উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরা ব্যক্তিগত শিক্ষক নিযুক্ত করে শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন
· খলিফা হারুন আল- রশীদের স্ত্রী যুবাইদা, বোন আব্বাসা বিনতে আল- মাহদী প্রমুখ শিক্ষিত ছিলেন
. সীমিত কিন্তু উপস্থিত প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ
· কিছু মসজিদে মহিলাদের জন্য আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা
·’ কুত্তাব'( প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র)- এ কখনো কখনো মেয়েদের অংশগ্রহণ

বিকাশ পর্ব( মধ্য আব্বাসী যুগ ৮৪৭- ৯৪৫ খ্রি.)

সামাজিক- সাংস্কৃতিক পরিবর্তন

· নগরায়ণের প্রভাব বাগদাদ, বসরা, কুফা, সামার্রা শহরগুলোতে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি
· মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় জ্ঞান- বিনিময় অনুবাদ আন্দোলনের মাধ্যমে গ্রিক, ফার্সি, ভারতীয় জ্ঞানের প্রসার
· বিত্তবান শ্রেণির বিকাশ বণিক ও আমলা শ্রেণির সম্প্রসারণ নারী শিক্ষার নতুন শ্রোতা তৈরি করে

শিক্ষার ক্ষেত্রের প্রসার

1. বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য
· ধর্মীয় শিক্ষা কুরআন, হাদিস, ফিকহ
· সাহিত্য ও কাব্য আরবি ভাষা, সাহিত্য, কবিতা
· ব্যবহারিক কলা চিকিৎসাবিদ্যা, সঙ্গীত, সূচিকর্ম
· দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা উচ্চবিত্ত পরিবারের কিছু নারী
2. বিদুষী নারীদের উত্থান
· শুহদা আল- বাগদাদিয়া( মৃত্যু ১১৭৮) হাদিস বর্ণনায় খ্যাতি, শিক্ষকতা
· সিত্ত আল- আরব( ১০ম শতক) আরবি ব্যাকরণ ও সাহিত্যে পণ্ডিত
· ফাতিমা আল- সামারকান্দি( ১২শ শতক) ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ
3. শিক্ষাদানের ভূমিকা
· কিছু নারী’ মুহাদ্দিসা’ হিসেবে হাদিস শিক্ষাদান করতেন
· অভিজাত পরিবারে নারী শিক্ষিকা(‘ মু’আল্লিমা’) নিযুক্ত হতেন
·’ রাব্বা আল- আদবিয়া'( মৃত্যু ৭৯৪)- বসরার খ্যাতনামা শিক্ষিকা ও কবি

পরিণতি পর্ব( পরবর্তী আব্বাসী যুগ ৯৪৫- ১২৫৮ খ্রি.)

প্রতিষ্ঠানিকীকরণের সীমাবদ্ধতা

1. মাদ্রাসা ব্যবস্থার বিকাশ( ১১শ শতক থেকে)
· নিজাম আল- মুলকের মাদ্রাসাগুলো প্রাথমিকভাবে পুরুষকেন্দ্রিক
· নারীদের আনুষ্ঠানিক মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বাদ
2. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
· স্পেনের কর্ডোবা খিলাফতে তুলনামূলক বেশি নারী শিক্ষার সুযোগ
· ফাতিমা আল- ফিহরি( ৮৫৯- ৮৮০) কর্তৃক কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
· মিশর ও সিরিয়ায় কিছু নারী পণ্ডিতের উল্লেখ
3. সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বৃদ্ধি
· রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্ষণশীলতার উদ্ভব
· নারীর প্রকাশ্য শিক্ষা ও কর্মকাণ্ডে কিছু সীমাবদ্ধতা

বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন

বিকাশের চালিকাশক্তি

1. ইসলামের শিক্ষাবিষয়ক আদর্শ জ্ঞানার্জনকে নারী- পুরুষ সবার জন্য ফরজ বলা হয়েছে
2. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অবসর সময়
3. বহুসাংস্কৃতিক প্রভাব বিভিন্ন সংস্কৃতির জ্ঞানভাণ্ডার থেকে শিক্ষা
4. রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা শিক্ষিত নারীদের জন্য খিলাফত দরবারে স্বীকৃতি

সীমাবদ্ধতাসমূহ

1. শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য শিক্ষা প্রধানত অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ
2. প্রাতিষ্ঠানিক বাধা আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণের অভাব
3. ঐতিহাসিক উপেক্ষা অনেক নারী পণ্ডিতের কাজ যথাযথভাবে রেকর্ড হয়নি
4. আঞ্চলিক পার্থক্য শহর vs গ্রাম, কেন্দ্র vs প্রান্তের বৈষম্য

টেকসই প্রভাব

1. পরিবারিক শিক্ষার ধারা মাতৃভাষা ও প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষায় নারীদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা
2. বিশেষায়িত ক্ষেত্র চিকিৎসা, হাদিস শিক্ষা, সাহিত্যে নারীদের অবদান স্বীকৃতি
. পরবর্তী যুগের ভিত্তি আব্বাসী যুগের সীমিত নারী শিক্ষাই পরবর্তী ইসলামী সমাজগুলোর জন্য প্রাথমিক নকশা তৈরি করে

আব্বাসী যুগে নারী শিক্ষার বিকাশ একটি বৈপরীত্যের গল্প । একদিকে জ্ঞান- বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উৎকর্ষ, অন্যদিকে নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা । তবুও এই যুগে নারী শিক্ষার যে বীজ রোপিত হয়েছিল, তা সামাজিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেই একটি স্বতন্ত্র পথ তৈরি করেছিল । এই বিকাশ রৈখিক না হয়ে ছিল চক্রীয় ও প্রাসঙ্গিক — সমাজের অবস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক খোলামলতার উপর নির্ভরশীল ।

আব্বাসী নারী শিক্ষার প্রকৃত গুরুত্ব তার গুণগত মান ও ব্যক্তিগত অর্জনে, যা পরিমাণগত প্রসারের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ।

  • শিক্ষক ও গবেষক : মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন
    প্রভাষক ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ।
    এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *