ডিজিটাল লেনদেন বিশ্বজুড়ে যত জনপ্রিয় হচ্ছে, ততই এর ওপর বাড়ছে অপরাধ জগতের নজর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল জালিয়াতি কেন্দ্র থেকে ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার গলি পর্যন্ত এখন অপরাধীদের অবাধ বিচরণ।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, টেলিগ্রাম ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অপরাধীরা শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।
ব্লকচেইন অ্যানালিটিক্স ফার্ম চেইনালাইসিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন বিভিন্ন চক্রের কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পেমেন্ট ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি পাবলিক ব্লকচেইনে শত শত কোটি ডলারের লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান বলেছে, এসব কার্যক্রমের বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত একটি অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত। সেখানে প্রতারণা কেন্দ্র, অবৈধ অনলাইন জুয়া এবং চীনা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক একসঙ্গে কাজ করছে।
প্রতিবেদনে চেইনালাইসিস মানব পাচারকারীদের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের বিষয়টি তিনটি ভাগে ব্যাখ্যা করেছে। প্রথমটি আন্তর্জাতিক এসকর্ট ও যৌন সেবা। দ্বিতীয়টি শ্রমিক নিয়োগকারী এজেন্ট ও অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র। তৃতীয়টি শিশু পর্নোগ্রাফি, অর্থাৎ ‘চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ম্যাটিরিয়াল’ বা সিএসএএম বিক্রেতা।
ব্লকচেইন ডেটা অনুযায়ী, এসব অপরাধমূলক সেবার বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক হলেও উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকেও গ্রাহকেরা অর্থ পাঠিয়েছেন। এতে ইঙ্গিত মিলছে, এ চক্রের কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিজেদের সেবার বিজ্ঞাপন দেওয়া, ভুক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলা এবং লেনদেন সমন্বয়ের জন্য সাইবার অপরাধীরা ক্রমেই টেলিগ্রামের মতো মেসেজিং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
চেইনালাইসিসের ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিস্ট টম ম্যাকলাউথ বলেছেন, “পুরানো বিভিন্ন ডার্কনেট ফোরাম ছেড়ে এখন মেসেজিং অ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো আধা-উন্মুক্ত ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে অপরাধীরা। ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে এসব অ্যাপের সমন্বয় অপরাধীদের বিভিন্ন নেটওয়ার্ককে আরও দ্রুত বড় হতে, ‘কাস্টমার সার্ভিস’ পরিচালনা করতে এবং কোনো বাধা ছাড়াই বিশ্বজুড়ে অর্থ লেনদেনে সাহায্য করছে।”
তবে চেইনালাইসিস জানিয়েছে, পাবলিক ব্লকচেইনের স্বচ্ছতার কারণে অপরাধমূলক অর্থের লেনদেন আগের তুলনায় আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অপরাধীদের কার্যক্রম বন্ধের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ম্যাকলাউথ বলেন, “এখানে মূল বোঝার বিষয়টি হচ্ছে, আর্থিক দিক থেকে এ অপরাধের আকার বিশাল, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অন্তত কয়েকশ কোটি ডলারের লেনদেন হচ্ছে। তবে মানুষের যে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে তা যে কোনো আর্থিক অংকের চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ।”
এসকর্ট ও যৌনবৃত্তি নেটওয়ার্ক
ব্লকচেইন কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক লেনদেনের পেছনে সুসংগঠিত অপরাধী চক্র সক্রিয়। কিছু দেশে এসকর্ট সার্ভিস বা যৌনবৃত্তি বৈধ হলেও চেইনালাইসিসের মতে, লেনদেনের নির্দিষ্ট কিছু ধরন ও আচরণ বিশ্লেষণ করে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহজনক কার্যক্রম আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়।
এসব চক্র দ্রুত অর্থ সংগ্রহে এখন ক্রিপ্টোমুদ্রা স্টেবলকয়েন এবং চীনা ভাষাভাষী বিভিন্ন অর্থ লেনদেনকারী দলের ওপর বেশি নির্ভর করছে। এই নেটওয়ার্কগুলো চীনা ভাষার টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে কার্যক্রম চালায়। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ লেনদেন করে তা পরে ‘বৈধ’ কাজে ব্যবহারে সাইবার অপরাধীদের সহায়তা করে।
চেইনালাইসিসের হিসাবে, ২০২৫ সালে এ ধরনের সেবার মাধ্যমে অন্তত ১ হাজার ৬১০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অবৈধ লেনদেন হয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক আন্তর্জাতিক এসকর্ট সেবাগুলো বড় অংকের লেনদেনের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে। এসব লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই ১০ হাজার ডলারের বেশি।
অন্যদিকে সাধারণ যৌনকর্মী সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কে লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলক কম, যা মূলত ১ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
এসব তথ্য ইঙ্গিত দেয়, কার্যক্রমগুলো কোনো একক ব্যক্তির নয়; বরং সুসংগঠিত এজেন্সি বা চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত।
শ্রমিক নিয়োগকারী ও প্রতারণা কেন্দ্র
চেইনালাইসিসের প্রতিবেদনের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তথাকথিত ‘শ্রমিক নিয়োগ এজেন্ট’দের কার্যক্রম। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতারণা কেন্দ্রে নিয়ে যায় এসব চক্র। এই কেন্দ্রগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক নানা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।
টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কর্মী নিয়োগ ফি সাধারণত ১ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলারের মধ্যে থাকে এবং তা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারে ‘কাস্টমার সার্ভিস’ কিংবা ‘ডেটা এন্ট্রি’ পদের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সেখানে মোটা অংকের মাসিক বেতন ও যাতায়াত খরচ দেওয়ার লোভনীয় প্রতিশ্রুতি থাকে।
কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীদের বিদেশিদের টার্গেট করে রোমান্স স্ক্যাম, ভুয়া ক্রিপ্টো ইনভেস্টমেন্ট স্কিম এবং অন্যান্য অনলাইন জালিয়াতিতে যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়।
চেইনালাইসিস কিছু টেলিগ্রাম আলাপ বিশ্লেষণ করে দেখেছে, নিয়োগকারীরা কর্মীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অর্থ পরিশোধের বিষয়েও আলোচনা করছিল।
এসব নিয়োগকারী চ্যানেলের সঙ্গে এমন কিছু ডিজিটাল ওয়ালেটের সংযোগ মিলেছে, যেগুলো আগে অবৈধ অনলাইন জুয়া ও অর্থ লেনদেন সেবার সঙ্গে জড়িত ছিল। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, মানব পাচারের এই কার্যক্রম বৃহত্তর কোনো অপরাধী নেটওয়ার্কের অংশ।
গত বছর এসব জালিয়াতি কেন্দ্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা মেলে। সে সময় কম্বোডিয়ার একটি বড় জালিয়াতি কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সমমূল্যের বিটকয়েন জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। চক্রটি প্রেমের অভিনয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিত।
শিশু যৌন নির্যাতন সামগ্রী বিক্রেতা
চেইনালাইসিস এমন কিছু নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে, যারা শিশু যৌন নির্যাতন সামগ্রী বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এসব চক্র অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীর তুলনায় ভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টো পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে। তবে তাদের কার্যক্রমেও উচ্চমাত্রার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং “অত্যন্ত উন্নত মানের আর্থিক ও বণ্টন কৌশল” লক্ষ্য করা গেছে।
সিএসএএম সংশ্লিষ্ট প্রায় অর্ধেক ক্রিপ্টো লেনদেনই ১০০ ডলারের নিচে। কারণ, প্রাইভেট চ্যাট গ্রুপ ও এনক্রিপ্টেড ফাইল-শেয়ারিং চ্যানেলে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক মডেলে তারা অর্থ সংগ্রহ করেছে।
ব্লকচেইন ট্র্যাকারদের মতে, এসব অপরাধী মূলধারার ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েনে অর্থ নেওয়ার পর দ্রুত তা ‘মনোরো’র মতো প্রাইভেসি কয়েনে রূপান্তর করে। পাশাপাশি এমন কিছু ‘ইনস্ট্যান্ট এক্সচেঞ্জ’ ব্যবহার করে, যেখানে পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না।
প্রতিবেদনে আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এসব সিএসএএম সাবস্ক্রিপশন পরিষেবার সঙ্গে প্রচলিত ‘স্যাডিস্টিক অনলাইন এক্সট্রিমিজম’ বা বিকৃত অনলাইন চরমপন্থা, সংক্ষেপে ‘এসওই’ কমিউনিটির যোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “এসব বিকৃত অনলাইন চরমপন্থী দল সুপরিকল্পিত সেক্সটরশন বা অনৈতিক ব্ল্যাকমেইল কৌশলের মাধ্যমে বিশেষভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্যবস্তু বানায় এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর সেই কনটেন্ট ক্রিপ্টোকারেন্সি পেমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করে, যা এই নির্যাতনের চক্রকে সচল রাখে।”
২০২৫ সালের জুলাইয়ে চেইনালাইসিস বলেছে, তরা যুক্তরাজ্যের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ডার্ক ওয়েবে পরিচালিত অন্যতম বড় একটি সিএসএএম ওয়েবসাইট শনাক্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে সহায়তা করেছে।








