বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

৯ লাখ টাকায় স্বপ্নের যাত্রা, দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু

১৮ বছর বয়সী ফাহাদের চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। তবে উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। দালালের মাধমে ইথিওপিয়া থেকে ১৫ দিন দুর্গম জঙ্গলে পথচলার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান ফাহাদ। তবে আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু হয় তাঁর।

হাসিখুশি ফাহাদ সব সময় বিদেশে যেতে চাইতেন। তাঁর দুই মামা দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করে ভালো আয় করেন। নিজেদের অবস্থা বদলেছেন। তাই তিনিও চাইতেন তেমন কিছু করবেন। ছেলের ইচ্ছা পূরণ করতে ৯ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে ফাহাদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠান তাঁর বাবা নুর মোহাম্মদ। তবে আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু হয় ফাহাদের।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে বিমানে দক্ষিণ আফ্রিকার পথে রওনা হন মো. ফাহাদ (১৮)। প্রথমে ইথিওপিয়া, সেখান থেকে আরেকটি বিমানে জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু তা আর হয়নি। দালালেরা ইথিওপিয়া থেকে জঙ্গলের পথ ধরে জিম্বাবুয়ে নিয়ে যায় তাঁকে। সেখান থেকে সড়ক পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার। রোববার সকালে ছেলে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেছেন—এমন খবর পান ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ (৪৫)। কিন্তু সেই রাতেই আরেকটি টেলিফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর আসে।

ফাহাদের কথা বলতে বলতে প্রতিমুহূর্তে কান্নায় গলা বুজে আসছিল নুর মোহাম্মদের। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেকে কখনো কোনো অভাব দেখাইনি। বলতাম, বাবা তুই পড়ালেখা কর। কিন্তু সে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। এরপর ব্যবস্থা করে দিই। এখন আমার ফাহাদ আর নেই।’

নুর মোহাম্মদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন মেজ। সম্প্রতি স্থানীয় কাঞ্চনাবাদ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি। চলতি বছর তাঁর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও আর পড়তে ইচ্ছুক ছিলেন না তিনি।

‘ছেলেকে অন্তত শেষবারের মতো দেখতে চাই। কীভাবে ওকে ছাড়া থাকব? এত হাসিখুশি ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।’

নুর মোহাম্মদ, ফাহাদের বাবা

একটি বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নুর মোহাম্মদ বলেন, ফাহাদের দুই মামা আগে থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকেন। তাঁদের সেখানে ব্যবসা আছে। ফাহাদের বড় মামা প্রায় ১০ বছর আগে এবং ছোট মামা ৮ মাস আগে একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন। ছেলের পীড়াপীড়িতে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে ফাহাদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

নুর মোহাম্মদ বলেন, ঢাকা থেকে ৩০ জানুয়ারি আফ্রিকার উদ্দেশে বিমানে ওঠেন ফাহাদ। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে হঠাৎ একটা ফোন আসে। ফোনে অপরিচিত একজন তাঁকে বলেন, ‘আপনার ছেলে ফাহাদ আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন, সে মারা গেছে।’

পরিবারের ধারণা, দীর্ঘ পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাবেই ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ফাহাদকে ২০০ ডলার দিয়েছিলেন। ব্যাগেও পর্যাপ্ত শুকনা খাবার দিয়েছিলেন। তবে জঙ্গলে তাঁর থেকে সবকিছু ছিনতাই হয়েছে। এ কারণে ফাহাদকে কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে।

নুর মোহাম্মদ জানান, দালালেরা ঢাকা থেকে প্রথমে ইথিওপিয়া ও জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত বিমানে নেওয়ার কথা বলেছিল। পরে সীমান্ত পার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফাহাদকে ইথিওপিয়া থেকে একাধিক দেশ ঘুরিয়ে সড়কপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়। এ কারণে অনেক সময় তাঁকে জঙ্গলে হাঁটতেও হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলে এ যাত্রা।

১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ফাহাদের ছোট মামা মোহাম্মদ ফয়সাল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নুর মোহাম্মদকে ফোন করেন। তিনি জানান, ফাহাদ দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছেছেন। সেখানের একটি কক্ষে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। শুনে স্বস্তি পেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। ওই দিন রাতেই ফাহাদের মৃত্যুর খবর আসে ফোনে। ফাহাদের সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট ও কাগজে দেওয়া ঠিকানা দেখে একজন নুর মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই খবর দেন।

ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ জানান, দালাল চক্রকে প্রথমে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। পরে যাত্রা শুরুর করার সময় ব্যাংকের হিসাব নম্বরের মাধ্যমে আরও সাত লাখ টাকা দেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানোর পর আরও দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। ফাহাদের মৃত্যুর খবরে দালালেরা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

শোকে কাতর নুর মোহাম্মদের কান্নারও শক্তি নেই। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে অন্তত শেষবারের মতো দেখতে চাই। কীভাবে ওকে ছাড়া থাকব? এত হাসিখুশি ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *