শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সবশেষ

ইফতারের পর মাথাব্যথা: কারণ, করণীয় ও প্রতিকার

রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময়টুকু সবার কাছেই স্বস্তির। কিন্তু অনেকেই লক্ষ্য করেন- ইফতারের কিছুক্ষণ পরই মাথাব্যথা শুরু হয়। কারও ক্ষেত্রে হালকা চাপধরা ব্যথা, কারও আবার তীব্র মাইগ্রেনের মতো ধকধকে যন্ত্রণা। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? এবং কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?

আজ আমরা ইফতারের পর মাথাব্যথার সাধারণ কারণ, ঝুঁকি এবং কার্যকর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ইফতারের পর মাথাব্যথার প্রধান কারণ

১. দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার প্রভাব (লো ব্লাড সুগার)

রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে। ইফতারের আগে অনেকেই দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব অনুভব করেন। ইফতারের পর হঠাৎ বেশি পরিমাণে খাবার খেলে শরীরের রক্তসঞ্চালন ও হরমোনে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে- যা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিসে ভোগেন বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

২. পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)

সারাদিন পানি না খাওয়ার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। পানিশূন্যতা মাথাব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। ইফতারের সময় যদি পর্যাপ্ত পানি না খেয়ে বরং ভাজাপোড়া ও চিনিযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া হয়, তাহলে মাথাব্যথা আরও তীব্র হতে পারে।

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায়- বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে এই ঝুঁকি বেশি।

৩. অতিরিক্ত বা ভারী খাবার গ্রহণ

ইফতারের সময় অনেকেই অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেল-চর্বিযুক্ত ও মশলাদার খাবার খান। হঠাৎ বেশি খাবার খেলে পরিপাকতন্ত্রে চাপ পড়ে। ফলে রক্তের একটি বড় অংশ পেটে কাজ করতে যায়, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে—এতে মাথাব্যথা হতে পারে।

এছাড়া অতিরিক্ত মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেটও রক্তে শর্করার ওঠানামা ঘটিয়ে মাথাব্যথার সৃষ্টি করতে পারে।

৪. ক্যাফেইন প্রত্যাহার (কফি বা চা কম খাওয়া)

যারা নিয়মিত চা বা কফি খান, রোজার সময় দিনে তা না খাওয়ায় শরীরে ক্যাফেইনের ঘাটতি তৈরি হয়। এটি “ক্যাফেইন উইথড্রয়াল হেডেক” নামে পরিচিত। ইফতারের সময় চা-কফি খেলেও অনেকের মাথাব্যথা পুরোপুরি সারে না, কারণ সারাদিনের ঘাটতি ইতিমধ্যেই প্রভাব ফেলেছে।

৫. অনিয়মিত ঘুম

রমজানে সেহরি, তারাবির নামাজ এবং রাতের ইবাদতের কারণে ঘুমের সময়সূচি বদলে যায়। ঘুমের ঘাটতি বা অনিয়ম মাথাব্যথার বড় কারণ। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই মাইগ্রেন আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে।

৬. উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা

কিছু ক্ষেত্রে ইফতারের পর মাথাব্যথা উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ হতে পারে। আবার সাইনাস সমস্যা, চোখের পাওয়ার পরিবর্তন, কিংবা মানসিক চাপও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। যদি মাথাব্যথা নিয়মিত ও তীব্র হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

মাইগ্রেন রোগী

ডায়াবেটিস রোগী

উচ্চ রক্তচাপের রোগী

নিয়মিত চা-কফি পানকারী

অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস যাদের

যারা ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খান

প্রতিকার ও করণীয়

১. ধীরে ও পরিমিত ইফতার করুন

ইফতার শুরু করুন পানি ও খেজুর দিয়ে। এরপর হালকা খাবার খান। একসাথে বেশি না খেয়ে ধীরে ধীরে খাবার গ্রহণ করুন। এতে রক্তে শর্করার হঠাৎ ওঠানামা কমবে এবং পরিপাকতন্ত্রের ওপর চাপও কম পড়বে।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করুন। সাধারণভাবে ৮–১০ গ্লাস পানি লক্ষ্য রাখতে পারেন। একসাথে অনেক পানি না খেয়ে সময় ভাগ করে পান করা ভালো।

লেবুর শরবত, ডাবের পানি বা ফলের প্রাকৃতিক জুস উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুন।

৩. ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত মিষ্টি কমান

পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপির মতো খাবার রমজানে জনপ্রিয় হলেও এগুলো সীমিত রাখুন। এর পরিবর্তে ফল, সালাদ, ছোলা, স্যুপ বা হালকা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এতে শক্তি মিলবে কিন্তু মাথাব্যথার ঝুঁকি কমবে।

৪. ক্যাফেইন ধীরে কমান

রমজানের আগে থেকেই চা-কফির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমানো ভালো। এতে রোজার সময় হঠাৎ ক্যাফেইন প্রত্যাহারের সমস্যা কম হবে। ইফতারের পরও অতিরিক্ত কফি না খেয়ে সীমিত রাখুন।

৫. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

চেষ্টা করুন প্রতিদিন অন্তত ৬–৭ ঘণ্টা ঘুমানোর। সেহরির পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত ঘুম মাথাব্যথা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৬. হালকা ব্যায়াম ও বিশ্রাম

ইফতারের পর হালকা হাঁটা উপকারী। এতে হজম ভালো হয় এবং রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। মাথাব্যথা শুরু হলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন, অন্ধকার ও শান্ত পরিবেশে চোখ বন্ধ করে বসুন।

৭. প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন

যদি মাথাব্যথা অত্যন্ত তীব্র হয়, বমি, ঝাপসা দেখা বা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়—তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

ঘরোয়া কিছু সহজ উপায়

কপালে ঠান্ডা পানির কাপড় রাখা

হালকা গরম চা (অতিরিক্ত না)

গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন

হালকা ম্যাসাজ

এসব উপায় অনেক সময় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।

>>> ইফতারের পর মাথাব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এটিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ঘুম এবং সংযমী জীবনযাপন এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

রমজান সংযমের মাস- খাদ্য ও জীবনযাপনে সংযম বজায় রাখলেই শরীর থাকবে সুস্থ, ইবাদত হবে প্রশান্তিময়। যদি নিয়মিত বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতা ও সঠিক অভ্যাসই পারে ইফতারের আনন্দকে ব্যথামুক্ত রাখতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *