ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে স্বস্তি, শোক এবং অনিশ্চয়তা—সব একসঙ্গে দেখা দিচ্ছে। অনেক ইরানির কাছে এটি সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা; কারও কারও কাছে দমন-পীড়নের এক অধ্যায়ের অবসান। কিন্তু বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—এটি হয়তো অত্যন্ত জটিল এক সমস্যার আশু সহজ সমাধান, যার পরিণতি অনিশ্চিত এবং বিপজ্জনকও হতে পারে।
শীর্ষ নেতৃত্ব অপসারণ, কিন্তু কাঠামো অটুট
চার দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের শাসন ব্যবস্থা এক ধরনের ধর্মতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদে রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রের সামরিক, গোয়েন্দা ও বিচারিক কাঠামোর ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। খামেনির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই শুধু একজন ব্যক্তির অবসান ঘটেছে, কিন্তু তার নির্মিত ক্ষমতার কাঠামো কি ভেঙে পড়েছে?
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রিত হওয়ার সুযোগে হামলাটি দ্রুততর করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে তার চিন্তা ছিল। তবে তিনি প্রকাশ্যে কোনো নাম বলেননি। এখন প্রশ্ন, তেহরান কাকে সামনে আনবে?
ভেনেজুয়েলার মতো নয় ইরান
কিছু বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের অতীত কৌশলের সঙ্গে তুলনা টানছেন। যেমন ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রশাসন নিকোলাস মাদুরোর বিকল্প হিসেবে বিরোধী নেতৃত্বকে সামনে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৯ কোটির বেশি মানুষের দেশটিতে লাখ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশ গত জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা রেখে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে। শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হওয়ায় সাময়িক শূন্যতা তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু এই কাঠামো দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করতে পারে।
কে নেবেন নেতৃত্ব
ইতিহাস বলছে, কেবল বিমান হামলা দিয়ে কোনো শক্ত রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সহজে ভেঙে ফেলা যায় না। আর ভেঙে গেলেও আক্রমণকারীদের পছন্দের বিকল্প শক্তি ক্ষমতায় আসে না। ইরানেও সেই ঝুঁকি প্রকট। কট্টরপন্থিরা ক্ষমতার শূন্যতা দ্রুত পূরণে তৎপর হতে পারে নিজেদের টিকে থাকার তাগিদেই। তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নিশানায় পরিণত হওয়ার ভয় পাবে, কিন্তু অতীতে এই ভয় নেতৃত্বের সংকট তৈরি করেনি। বরং শক্ত অবস্থানই ছিল তাদের রাজনৈতিক পুঁজি।
আরেকটি সম্ভাবনা—শাসকগোষ্ঠীর ভেতর থেকে এমন কোনো ঐকমত্য তৈরি হওয়া, যেখানে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সাময়িক নমনীয়তার ভান করা হবে। তবে সেটি তেহরানের কাছে দুর্বলতার বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ভাঙনের ঝুঁকি
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—কোনো একক গোষ্ঠী যদি নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে, তাহলে ইরান আংশিক ভাঙনের দিকে যেতে পারে। একদিকে উদযাপন, অন্যদিকে প্রতিশোধ ও সহিংসতা—এই দ্বিমুখী বাস্তবতা দেশটিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতি শুধু ইরান নয়, গোটা অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক।
প্রতিবেশী দেশগুলো এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যারা আগে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে বলেছিল, তারাই এখন নিজেদের ভূখণ্ডে হামলার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়ানোর ক্ষেত্রে অনাগ্রহী। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন, দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি বা পর্যাপ্ত সামরিক সম্পদ, সব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে আঘাত করা। শাসন পরিবর্তন ছিল উৎসাহিত একটি ধারণা, আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নয়।
ফলে তিনি যে কোনো সময় ‘সাফল্য’ ঘোষণা করতে পারেন—ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা যাই হোক না কেন।
দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা
প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আধিপত্য তাদের দ্রুত ও নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম করেছে। কিন্তু ইরানের জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো, দীর্ঘদিনের মতাদর্শিক ভিত্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাববলয় এসবকে কেবল শীর্ষ নেতৃত্ব সরিয়ে দিয়ে বদলানো সম্ভব নয়।
অর্ধ শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান এক কৌশলগত ‘প্রতিবন্ধক’। খামেনির অপসারণ সেই কাঁটা তুলে ফেলেছে, নাকি আরও গভীরে প্রবেশ করিয়েছে, তা এখনই বলা কঠিন।
একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করা সহজ, কিন্তু সেই শূন্যতা কে এবং কীভাবে পূরণ করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী অধ্যায়।








