সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

পারমাণবিক বোমার চেয়েও বড় আতঙ্কে আরব বিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের নজর ঘুরছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকেই। তেল সংকটের আশঙ্কাও বেড়েই চলেছে। কিন্তু শত্রুস্বভাপন্ন ইরানের তেল-কুবের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য আতঙ্কের কারণ শুধু পারমাণবিক বোমা কিংবা তেল বাজারে অস্থিরতা নয়, তার চেয়েও বড় ভয় নিজেদের পানি শোধনাগার নিয়ে। আরব ভূখণ্ডের অনেক দেশই তাদের সুপেয় পানির জন্য পানি বিশুদ্ধকরণের (ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট) ওপর নির্ভরশীল। সাগরের নোনা জল টেনে খাবার উপযোগী করে। যুদ্ধের মধ্যে এসব স্থাপনায় হামলা, নাশকতা বা সাইবার আক্রমণের লক্ষ্য হলে মুহূর্তের মধ্যেই তৈরি হতে পারে ভয়াবহ মানবিক সংকট। ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের বড় অশনিসংকেত এবার এটাই। উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশেই এই একই ভয়। যতটা প্রতিবেশীদের; ততটা ইরানেরও। বিপদের আগাম পূর্বাভাস দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাতে তেল বাজার নয় বরং পানির নিরাপত্তাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। ইতোমধ্যেই (বৃহস্পতিবার) বাহরাইনের তেলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা হতাহতের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। শনিবার ইরানের কেশম দ্বীপের পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। প্রায় ৩০টি গ্রাম ওই পানি শোধনাগারের ওপর নির্ভরশীল। এপি।

উপসাগরীয় অঞ্চলের পানির নির্ভরতা : বিশ্বের ১০টি বৃহত্তম ডেস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে ৮টিই আরব উপদ্বীপে অবস্থিত। তালিকার বাকি দুটি রয়েছে ইসরাইলের সোরেক প্ল্যান্টে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের মরুভূমির নিচে থাকা বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ শুধু অর্থ উপার্জনের জন্যই ব্যবহার করে না, সেই জ্বালানিই আবার সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধ করে পানযোগ্য পানিতে রূপান্তরের প্রধান শক্তি হিসাবে কাজ করে। এই অঞ্চলে ৪০০-এর বেশি ডেস্যালিনেশন প্ল্যান্ট রয়েছে। মিডলইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)-এর দেশগুলো বিশ্বের মোট বিশুদ্ধকৃত লবণাক্ত পানির প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে। যা কোটি মানুষের জীবনযাত্রা সচল রাখছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষ তাদের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণে এই ডেস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বাস্তবে এসব প্ল্যান্ট ছাড়া কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি সৌদি আরবের মানুষের জীবনযাত্রা কার্যত অসম্ভব। কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ পানি আসে ডিস্যালিনেশন থেকে। ওমানে এই হার ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবে প্রায় ৭০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের কঠিন আবহাওয়া, অল্প বৃষ্টিপাত, দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির উৎস এবং বাড়তে থাকা জনসংখ্যার কারণে ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তি এই অঞ্চলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আর শুধু প্রযুক্তিগত সহায়ক ব্যবস্থা নয় বরং পুরো অঞ্চলের জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

পানি সরবরাহে নাশকতার আশঙ্কা : পানি সরবরাহে নাশকতার আশঙ্কা নতুন নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলোর ওপর হামলার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ১৯৮০-এর দশক থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের সময় সেই আশঙ্কা বাস্তব রূপ নেয়। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জোট বাহিনী ইরাকি লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা শুরু করলে তার জবাবে ইরাকি বাহিনী পারস্য উপসাগরে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছেড়ে দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় বড় পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের পানি গ্রহণের বাল্ব রক্ষার জন্য ভাসমান সুরক্ষা বাঁধ বসানো হয়। বিশেষ করে যে প্ল্যান্টটি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বড় অংশে পানি সরবরাহ করে, সেটিকে রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই হুমকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

২০১৯ এবং ২০২২ সালে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন সৌদি আরবের আল-শুকাইক স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর আবারও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর ওপর

হামলার আশঙ্কা সামনে আসে। যদিও তাতে স্থায়ী কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতা হুথিদের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত এবং বিস্তৃত। ফলে ইরান যদি সরাসরি এসব ডেস্যালিনেশন প্ল্যান্টকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে। এখানে একটি বৈপরীত্যও রয়েছে। ইরানের রাজধানী তেহরানে পানির সংকট এতটাই তীব্র যে, ২০২৫ সালে দেশটির সরকার খরায় জর্জরিত রাজধানীটি উপকূলীয় অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করেছিল। যদিও ইরান লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের ওপর হামলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তাদের পানির সরবরাহ মূলত বাঁধ ও ভূগর্ভস্থ কূপের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাতের পেছনে রাজনৈতিক ও সামরিক নানা কারণ থাকলেও ভবিষ্যতে পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদান হয়ে উঠতে পারে। পানি সরবরাহ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা শুধু অর্থনীতি নয়, পুরো অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতিকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

খাদ্য সরবরাহের ঝুঁকি : চলমান যুদ্ধের ফলে ভয়াবহ খাদ্য সংকটেও পড়বে গালফ দেশগুলো। হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং বিমান চলাচলে বাধার কারণে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক স্ক্রিস্টিয়ান হেন্ডারসন বলেন, কিছু গালফ দেশ তাদের খাদ্যের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই আমদানি করে এবং তাদের অর্থনীতি পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *