বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

সবশেষ

নির্যাতনের শিকার শিশুটির জীবন বাঁচলেও মা হতে পারবে না কোনোদিন

নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার বাউসী ইউনিয়নের শাসনউড়া গ্রামে মাত্র ৭ বছর বয়সী এক শিশু প্রতিবেশী কিশোরের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এমনভাবে আহত হয়েছে যে, তাকে বাঁচাতে চিকিৎসকদের শেষ পর্যন্ত অপসারণ করতে হয়েছে তার জরায়ু। ফলে জীবনভর মা হওয়ার সম্ভাবনা হারালো অবুঝ শিশুটি।

ঘটনাটি ঘটে প্রায় দুই মাস আগে, চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী কিশোর নুরজামাল (১৬) কৌশলে শিশুটিকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে যায় এবং তার ওপর চালায় ভয়াবহ নির্যাতন।

ঘটনার ভয়াবহতায় আতঙ্কিত হয়ে শিশুটি প্রথমে কাউকে কিছু বলতে পারেনি। বরং বিষয়টি কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয় তাকে। ফলে নীরব কষ্ট বুকে নিয়েই দিন কাটাতে থাকে সে।

অসুস্থতা থেকেই বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সত্য

শিশুটির বাবা সরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার কিছুদিন পর থেকেই মেয়ের পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। প্রথমে বিষয়টি সাধারণ অসুস্থতা মনে করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বলেন, “ডাক্তারের ওষুধ খেলে কয়েকদিন ভালো থাকত, আবার ব্যথা শুরু হতো। আমরা বুঝতেই পারিনি ভেতরে এত বড় বিপদ লুকিয়ে আছে।”

ক্রমশ অসুস্থতা বাড়তে থাকলে ঢাকায় নিয়ে এসে চিকিৎসক দেখায় শিশুটির পরিবার। কয়েকদিন আগে চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেন। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে পরিবারের মাথায়।

ডাক্তাররা জানান, শিশুটির সঙ্গে মারাত্মক কিছু ঘটেছে। পরে মেয়েকে আশ্বস্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায়, কীভাবে নুরজামাল তাকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে এই নির্যাতন করেছে।

জীবন বাঁচাতে জরায়ু অপসারণ

পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখতে পান, নির্যাতনের কারণে শিশুটির ডিম্বাণু ও জরায়ুতে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

অবশেষে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য অস্ত্রোপচার করে জরায়ু অপসারণ করতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার সময় চিকিৎসকরা পরিবারকে এই দুঃসংবাদ জানান।

শিশুটির বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাচ্চাটা কোনোদিন মা হতে পারবে না। যে অপরাধ করেছে তার বিচার চাই।’

ঘটনার পর চাপ ও আপসের চেষ্টা

এই নির্মম ঘটনার পরও স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির পরিবার।

সরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকার অনেকেই আমাকে ফোন করে বলছে মামলা না করতে। টাকা দিয়ে মীমাংসা করে ফেলতে বলছে। কিন্তু আমি আমার মেয়ের সর্বনাশের বিচার চাই।’

নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার

ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে শিশুটি ও তার পরিবার বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানিয়েছে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। ‘স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি’র কর্মসূচি ব্যবস্থাপক কোহিনূর বেগম জানান, ‘ভুক্তভোগী পরিবারকে আমরা আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।’

পুলিশের বক্তব্য

বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হাসান বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনও থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *