ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনা। তবে সে লক্ষ্য পূরণ এখনো বাস্তবতায় সম্ভব নয় বুঝে গেছে তারা। এরপর ওয়াশিংটন থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাদের এখন নতুন করে হিসাবনিকাশ করতে হচ্ছে। কারণ, ইরানের নানামুখী রণকৌশল ও পরিকল্পনা। তেহরান প্রায় প্রতিটি স্তরে কম করে হলেও বিকল্প চারটি ব্যবস্থা করে রেখেছে।
আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রাজধানী তেহরানে বোমা হামলা হলেও দেশটির যুদ্ধের সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না। গত দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কৌশলগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ইরান এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতেও লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম। ইরানের সামরিক চিন্তাবিদদের ভাষায়, এই কৌশলের নাম ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স বা বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
কী এই ‘মোজাইক ডিফেন্স’: এই প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল ভিত্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান তার শীর্ষ কমান্ডার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হারালেও যুদ্ধ থামবে না। ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) প্রধান থাকা মোহাম্মদ আলী জাফারি এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
এই মডেলে পুরো রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ৩১টি প্রদেশে আধা-স্বায়ত্তশাসিত স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যদি কেন্দ্রীয় কমান্ড ভেঙে পড়ে বা শীর্ষ নেতারা নিহত হন, তবুও স্থানীয় ইউনিটগুলো নিজস্ব সিদ্ধান্তে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর লক্ষ্য হলো একটি মাত্র বিধ্বংসী হামলায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঠেকানো।
২০০১ সালে আফগানিস্তান এবং ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর সাদ্দাম হোসেনের পতন দেখে ইরান এই শিক্ষা নিয়েছে যে, অতি-কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় শীর্ষ কাঠামোয় আঘাত করলে দ্রুত পতন ঘটে। তাই ইরান তার শক্তি এক জায়গায় ধরে না রেখে ছড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের এই ডকট্রিনের দুটি প্রধান লক্ষ্য। প্রথমত, কমান্ড সিস্টেমকে ধ্বংস করা অসম্ভব করে তোলা।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করে শত্রুর জন্য তা ব্যয়বহুল ও অসহনীয় করে তোলা।
‘চতুর্থ উত্তরাধিকারী’ পরিকল্পনা: এই কৌশলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো চতুর্থ উত্তরাধিকারী পরিকল্পনা। রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহতের আগেই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক পদের জন্য অন্তত চারজন করে উত্তরসূরি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। একজন নেতা নিহত বা নিখোঁজ হলে তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ ব্যক্তি দায়িত্ব বুঝে নেবেন। এটি করা হয়েছে যাতে নেতৃত্বের শূন্যতায় কোনোভাবেই সামরিক পক্ষাঘাত তৈরি না হয়।
সময়কে যেভাবে অস্ত্র বানায়: ইরানের কৌশলে যুদ্ধ মানে শুধু গোলাবর্ষণ নয়, এটি একটি সহনশীলতার পরীক্ষা। যেমন, একটি ‘শাহেদ’ ড্রোন তৈরি করতে ইরান যে সামান্য অর্থ ব্যয় করে, তা ধ্বংস করতে শত্রুপক্ষকে তার চেয়ে বহুগুণ দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করতে হয়। এভাবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে শত্রুর অর্থনীতি ও মনোবলের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই তেহরানের মূল লক্ষ্য।
মূলত মাও সে তুংয়ের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তত্ত্বের আদলে গড়ে ওঠা এই কৌশলটি ইরানকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছে, যেখানে শীর্ষ নেতার মৃত্যুও যুদ্ধের সমাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
মাঠের যুদ্ধে কৌশল: ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) প্রথম ধাক্কা সামলানোর দায়িত্ব পালন করে। এরপর আইআরজিসি এবং বাসিজ বাহিনী গেরিলা কায়দায় চোরাগোপ্তা হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি লড়াই শুরু করে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী স্থানীয় কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। মূলত এটি তাদের সমান্তরাল সেনাবাহিনী রাখার কৌশল। নিয়মিত সেনাবাহিনী সীমান্ত রক্ষা করবে আর আইআরজিসি অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিভাগ সমন্বয় করে আক্রমণ জোরদার করবে। যেহেতু তাদের হাতে ইরানের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অস্ত্র ভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ। তারা সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা অনুযায়ী শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
ইরানের সামরিক কৌশল হলো—সমুদ্রপথে হরমুজ প্রণালিতে ছোট দ্রুতগামী বোট, মাইন এবং জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে শত্রু চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়। পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধকে শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠীসহ আঞ্চলিক মিত্র বাহিনী ব্যবহার করে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করা। এসবের মাধ্যমে অপ্রতিসম যুদ্ধ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এর পাশাপাশি চীনের মতো দেশগুলোর কাছে তেল রপ্তানির পথ খোলা রেখে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া প্রভাব ব্যবহার করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রতিহত করা।








