বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধ: হামলা-পাল্টা হামলার ১২ দিনে যা ঘটল?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ১২তম দিনে গড়িয়েছে। তেহরানের দাবি, দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা হয়েছে এবং এতে এখন পর্যন্ত ১৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১০ মা্চ) রাতভর তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় ইসরায়েল। পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানও, যার প্রভাব পড়েছে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও বেড়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে যুদ্ধের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়ায় কংগ্রেসের সদস্যরা প্রকাশ্য শুনানির দাবি তুলেছেন।

যুদ্ধের ১২তম দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। নিচে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো।

ইরানের ভেতরে পরিস্থিতি
বেসামরিক হতাহত: তেহরানের অভিযোগ, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এতে ১৩০০-এর বেশি সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে।

বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা: জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িঘর ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

তেহরানে বিমান হামলা: মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলি বিমান হামলার “বড় ঢেউ” আঘাত হানে তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায়। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, একটি আবাসিক ভবনে আঘাত লাগে এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছেন।

ইরানের পাল্টা হামলা: দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ৩৭তম দফায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ভূখণ্ড ও মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে। এতে “সুপার-হেভি খোরামশাহর” ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বহুস্তরীয় আক্রমণ চালানো হয়। লক্ষ্যবস্তু ছিল তেল আবিব, হাইফা ও পশ্চিম জেরুজালেমসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকা এবং ইরাকের এরবিল, বাহরাইন ও মানামায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা অব্যাহত: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, মঙ্গলবার হবে হামলার “সবচেয়ে তীব্র দিন।” তেহরানের অন্তত আটটি জেলায় হামলা হয়েছে এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির অন্যান্য শহরেও আক্রমণ করা হয়েছে।

বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ারি: এদিকে ইরানে কিছু জায়গায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে দেশটির পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান বলেছেন, যারা শত্রু রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে অবস্থান নেবে তাদের আর বিক্ষোভকারী হিসেবে নয়, “শত্রু” হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বিষাক্ত ব্ল্যাক রেইন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর ধোঁয়া ও মেঘ মিশে “ব্ল্যাক রেইন” বা কালো বৃষ্টি নামে দূষিত বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনটি দেখাও গেছে দেশটিতে। তেহরানসহ জ্বালানি স্থাপনা থাকা এলাকাগুলোতে আগুনের ঘন ধোঁয়া বৃষ্টির মেঘের সাথে মিশে গেছে, যা বিষাক্ত দূষণকারী বহনকারী দূষিত বৃষ্টিপাত তৈরি করছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে উত্তেজনা
সৌদি আরব: সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একাধিক হামলা প্রতিহত করেছে তারা। কিছু হামলা ছিল পূর্বাঞ্চল ও প্রিন্স সুলতান এয়ারবেস লক্ষ্য করে।

কাতার: কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে এবং পরে মন্ত্রণালয় জানায়, নিরাপত্তা হুমকি রোধ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: ইউএই জানিয়েছে, মঙ্গলবার ২৬টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তারা। তবে নয়টি ড্রোন তাদের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। একটি হামলায় আবুধাবির রুওয়াইস শিল্প কমপ্লেক্সে আগুন লাগে, যেখানে দেশটির বৃহত্তম তেল শোধনাগার রয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সমন্বয় ও কূটনৈতিক আহ্বান: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সৌদি প্রতিরক্ষা জোরদার নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়া কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুলআজিজ আল-খুলাইফি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় ফেরার অনুরোধ করেছেন।

বিশ্বের বড় তেল শোধনাগার বন্ধ: সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগারগুলোর মধ্যে একটি রুওয়াইস। ড্রোন হামলার পর সতর্কতা হিসেবে মঙ্গলবার স্থাপনাটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি।

কুয়েতে লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন ঘাঁটি: ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে অন্তত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে কুয়েত এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

কার্গো জাহাজে হামলা: ব্রিটিশ সামরিক সূত্র জানিয়েছে, অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে আগুন লেগেছে। এরপরপরই ক্রুরা জাহাজ ত্যাগ করতে শুরু করে।

কংগ্রেসের চাপ ও মার্কিন সেনা হতাহত: গোপন ব্রিফিংয়ের পরও যুদ্ধের লক্ষ্য পরিষ্কার না হওয়ায় মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা প্রকাশ্য শুনানির দাবি জানিয়েছেন। পেন্টাগন জানিয়েছে, “অপারেশন এপিক ফিউরি” শুরু হওয়ার পর থেকে ১৪০ জন মার্কিন সেনা আহত এবং সাতজন নিহত হয়েছেন।

স্কুলে হামলার তদন্ত: হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানে ৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় প্রায় ১৭৫ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে।

হরমুজে ইরানি জাহাজ ধ্বংস: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে ১৬টি ইরানি মাইন-বসানো জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলে পরিস্থিতি
ইরানের পাল্টা হামলা: 
ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া সব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে তেল আবিব। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বাজানো হচ্ছে সতর্কতা সাইরেন।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে মার্কিন সতর্কতা: যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইসরায়েলকে জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়— এমন তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস, যদিও এটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

সাইবার হামলা: ইসরায়েলের সাইবার নিরাপত্তা অধিদপ্তর জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নিরাপত্তা ক্যামেরায় কয়েক ডজন ইরানি লঙ্ঘন শনাক্ত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় জনসাধারণকে পাসওয়ার্ড এবং সফ্টওয়্যার আপডেট করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কূটনৈতিক সমন্বয়: মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, তিনি সম্ভবত আগামী সপ্তাহে অব্যাহত সামরিক অভিযানের সমন্বয় করতে ইসরায়েল ভ্রমণ করবেন।

লেবানন ও ইরাক পরিস্থিতি
বৈরুতে বিমান হামলা তীব্রতর: ইসরায়েলি বাহিনী বৈরুতের একটি আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়েছে, এতে আগুন লাগে এবং ভবনের কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লেবাননের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫৭০ জন নিহত হয়েছেন দেশটিতে।

ইরানি কূটনীতিকদের হত্যা ও বিপুল মানুষ বাস্তুচ্যুত: বৈরুতে এক হামলায় চারজন ইরানি কূটনীতিক নিহত হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিচার দাবি করেছে দেশটি। একইসঙ্গে তেহরান এই ঘটনাকে “সন্ত্রাসী হামলা” বলে অভিহিত করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কারণে লেবাননে ৬ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ইরাকে হামলা: ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, দেশটিকে যেন হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। কারণ, মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়েছে, যার মধ্যে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীও ছিল।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *