সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

সবশেষ

মিলেমিশে দখলে নিয়েছেন বিএনপি-জামায়াত নেতা

রাজশাহীতে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার ইজারা নেওয়া পার্ক বিএনপি, যুবদল ও জামায়াতের তিন নেতা মিলেমিশে দখলে নিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে শহীদ জিয়া শিশু পার্কটি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আনোয়ার হোসেন নামের এই ইজারাদার রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি। তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে রাজশাহীতে একাধিক মামলা রয়েছে। পার্কটির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আনোয়ার সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছেন। তবে পার্ক দখলকারী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ আইন মেনে চুক্তির মাধ্যমে পার্কটি তারা নিয়েছেন।

জানা গেছে, এই পার্কটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক)। ইজারাদার আনোয়ারের প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজ। বর্তমানে পার্কটি পরিচালনা করছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি শাকিলুর রহমান, শাহ মখদুম থানা বিএনপির সদস্য সচিব নাসিম খান এবং মহানগর যুবদলের সদস্য আরিফুজ্জামান সোহেল। এদের মধ্যে শাকিলুর রহমানকে গত বছরের ২৭ মার্চ সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছে জামায়াত। তিনি জামায়াতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে থাকেন। গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে প্রচারণায়ও ছিলেন তিনি।

শাকিলুর রহমান ৫ আগস্ট পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় ওই পার্কে অবস্থানের ছবি ও ভিডিও নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। পার্কের সংস্কার কাজ করছেন বলে সেসব পোস্টে তিনি জানিয়েছেন। কখনো কখনো তার সঙ্গে পার্কে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদেরও দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পার্কের আয়ের একটি অংশের ভাগ করপোরেশনের কর্মকর্তারাও পেয়েছেন।

এদিকে পার্কটি বেদখল হয়ে যাওয়ায় ইজারাদার আনোয়ার ১১ মার্চ রাসিকের সচিবের দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, পার্কটি ১৪৩১, ১৪৩২ ও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের মেয়াদে ইজারা পেয়ে যথাযথভাবে পরিচালনা করছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত পার্কটি কথিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্র অবৈধ দখল করে নেয়। এতে তিনি আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই তিনি তাকে পার্ক বুঝিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিন বছরের জন্য পার্কটি উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজকে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। ইজারামূল্যের সঙ্গে আরও ৩৬ লাখ টাকা ভ্যাট ও আয়কর যুক্ত হয়। মোট ১০ কিস্তিতে টাকা পরিশোধের কথা। এ পর্যন্ত ছয়টি কিস্তিতে ৯০ লাখ টাকা পরিশোধ হয়েছে। সবশেষ গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নথিপত্রে এখন পর্যন্ত পার্কের বৈধ ইজারাদার মেসার্স উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজ।

রোববার দুপুরে পার্কের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই দেখা যায়, বাস, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের জন্য স্লিপ দিয়ে টাকা নিচ্ছেন হাসিবুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। বাসের জন্য ১৫০ টাকা, মোটরসাইকেল ২০ টাকা ও মাইক্রোবাসের জন্য ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। পার্কে জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা। হাসিবুল জানান, ২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে শাকিলুর রহমান, নাসিম খান ও আরিফুজ্জামান সোহেল পার্কটি পরিচালনা করছেন।

পার্কে এ সময় ছিলেন ব্যবস্থাপক নাজমুল মুজাহিদ হোসেন। তিনি নিজেকে ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক পরিচয় দেন। তবে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। পার্কের আয়ের অর্থ নিয়ে যান শাকিলুর রহমান, নাসিম খান ও আরিফুজ্জামান সোহেল। পার্কে ছিলেন সিটি করপোরেশনের দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী চন্দন কুমার ঘোষ। তিনিও একই কথা জানান।

পার্ক দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর যুবদলের সদস্য আরিফুজ্জামান সোহেল বলেন, শাকিল নাকি পার্ক ইজারাদারের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে। কিছু সংস্কার কাজের জন্য তখন কিছু টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আমি নিজে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। কিন্তু শাকিল কোনো হিসাব দেয় না, লাভও দেয় না। প্রথম চার মাস আমি ছিলাম। এখন নেই।

শাহ মখদুম থানা বিএনপির সদস্য সচিব নাসিম খান বলেন, পার্ক দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের দোসর। খুনি। হত্যা মামলার আসামি। সিটি করপোরেশনকে কিস্তি না দিয়েই পালিয়েছে। আমরা কিস্তি পরিশোধ করে আসছি। সেই রসিদও আমাদের কাছে আছে।

জামায়াত নেতা শাকিলুর রহমান বলেন, আনোয়ারের নামে লাইসেন্স ব্যবহার করে সাবেক পাঁচ কাউন্সিলর পার্কটি চালাতেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে এফিডেভিট করেছি। তার অনেক রকম স্বাক্ষর হতে পারে। আনোয়ার আমাদের সামনেই স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেছেন। সিটি করপোরেশনের কিস্তিও আমরা দিয়ে আসছি। শেষ দুইটা কিস্তি দিতে পারিনি। এজন্য সে অভিযোগ করেছে। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এটা ভুল বোঝাবুঝি।

শাকিলুর রহমান তিন পাতার একটি এফিডেভিটের কপি হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিবেদকের কাছে পাঠান। এতে দেখা যায়, এফিডেভিটেও উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটরের স্বাক্ষর আছে। তবে সিটি করপোরেশনে আনোয়ার হোসেন যে অভিযোগ দিয়েছেন সেই অভিযোগপত্রের সঙ্গে এফিডেভিটে থাকা স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। দুটি স্বাক্ষর দুই রকম দেখা যায়।

এফিডেভিটে সাক্ষী হিসাবে মো. জাকারিয়া হোসেন ও মো. সোহেল আহসান নামের দুজনের স্বাক্ষর ও মোবাইল নম্বর আছে। জাকারিয়া হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি এই এফিডেভিটে স্বাক্ষরের বিষয়টি মনে করতে পারেননি। সোহেল আহসানকে ফোন করে কথা বলার একপর্যায়ে ওই মোবাইল থেকেই কথা বলতে শুরু করেন শাকিলুর রহমান।

ইজারা গ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন পলাতক থাকায় চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সিটি করপোরেশনের এস্টেট অফিসার আবু নূর মো. মতিউর রহমান বলেন, আমাদের এখানে এখনো বৈধ ইজারাদার আনোয়ার হোসেন। পার্ক দখলের ব্যাপারে তিনি কদিন আগে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জেনেছি। করপোরেশনের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিবের দপ্তর হয়ে অভিযোগটি আমার কাছে আসবে। তারপর আমরা সরেজমিন দেখে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব। তিনি জানান, এই পার্ক কাউকে সাব-লিজ দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। সেটি করলে ইজারা বাতিল হয়ে যাবে। কারণ, পার্ক পরিচালনার অভিজ্ঞতাসহ বেশকিছু শর্তেই ইজারা দেওয়া হয়।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ইজারাদারের অভিযোগটি আমার দেখার সুযোগ হয়নি। সেটা হাতে পেলে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *