সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

তিন দশক আগের আতঙ্ক ফিরে আসার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ক্ষুদ্র দেশ কুয়েতের মানুষের মনে তিন দশক আগে ইরাকি আগ্রাসনের ক্ষত এখনও স্মৃতিতে অমলিন। ১৯৯০ সালের সেই ভয়াবহ উপসাগরীয় যুদ্ধ কুয়েতকে দাঁড় করিয়েছিল এক অন্ধকার অধ্যায়ের মুখোমুখি। সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী মুহূর্তের মধ্যে দখল করে নিয়েছিল দেশটির তেলসমৃদ্ধ এলাকা। ইতিহাসের সেই কঠিন দিনগুলো আজও কুয়েতিদের মনে আতঙ্ক ছড়ায়। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো লক্ষ্য করে ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ আবার এক ভিন্ন সংকটের মধ্যে এনে ফেলেছে কুয়েতকে। এবার কুয়েত জড়িয়ে পড়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সরাসরি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে।

এ বিষয়ে গতকাল রোববার সাংবাদিক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞ নিক রবার্টসনের লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে সিএনএন। এতে বলা হয়, কয়েক দশকের পুরোনো যুদ্ধের ক্ষত শুকানোর আগেই কুয়েত এখন আরও একটি নতুন যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ ও তুলনামূলক শান্তিতে থাকা কুয়েতিদের জন্য ইরানের এই আকস্মিক ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। ইরানের ছোড়া একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দেশটির বিমানবন্দর, বহুতল আবাসিক ভবন এবং তেল টার্মিনালগুলো বিধ্বস্ত হওয়ায় অনেক বিদেশি ইতোমধ্যে কুয়েত ছাড়ছেন।

ইরান থেকে মাত্র ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত কুয়েতের মানুষের কাছে এই সংঘাত যেন ১৯৯০ সালের সেই ভয়াবহ উপসাগরীয় যুদ্ধের দুঃস্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। কুয়েত সিটির উপকণ্ঠে সত্তরোর্ধ্ব মৎস্যজীবী খালেদ আল-ওজাইনা ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী যখন কুয়েত দখল করে, সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেটাই ছিল শেষবার যখন আমরা মাছ ধরতে যেতে পারিনি। তাঁর পরিচালিত ফিশিং ক্লাবের শত শত প্রমোদতরী এখন সমুদ্রের ডকইয়ার্ডে অলস পড়ে আছে।

খালেদ আল-ওজাইনা বলেন, ১৯৯০ সালের পরিস্থিতির মতো এখনকার অবস্থা খারাপ হয়তো এতটা না। তবে পরিস্থিতি অবশ্যই বিপজ্জনক। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সেই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

১৯৯০ সালে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের আগ্রাসন ও যুদ্ধ কুয়েতের জাতীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। ওই যুদ্ধের জের ধরেই কুয়েতের ভাগ্য আজ যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এক সুতোয় বাঁধা। সেই সময় সাদ্দামের রিপাবলিকান গার্ড বাহিনী দুই দিনের মধ্যেই কুয়েতের তেলক্ষেত্রসহ পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং শুরু হয় কুয়েতের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। সাত মাসের ওই দখলে হাজার হাজার কুয়েতি সেনা ও বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান। পরবর্তী সময় ৩৯টি দেশের প্রায় পাঁচ লাখ সদস্যের বিশাল এক জোট ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’-এর মাধ্যমে ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করে।

তবে ইরাকি বাহিনী ফেরার পথে কুয়েতের তেলকূপগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ঘন কালো ধোঁয়া ও বৃষ্টির সঙ্গে তেল ঝরার কবলে পড়ে কুয়েত। ওই যুদ্ধের অংশ হিসেবেই কুয়েতে বেশ কিছু বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়, যেগুলো এখন ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু। এই নতুন সংঘাতে ইতোমধ্যে কুয়েতে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রাণ গেছে আরও চার কুয়েতি সেনার।

তবে কুয়েতের বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও কিছুটা স্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ৬৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার খালেদ আল-রাশিদ বলেন, নব্বই দশকের মতো ভয়াবহ অবস্থা এটি নয়। এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হচ্ছে এবং কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার ৯৮ শতাংশই নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে। রাজধানীর রাস্তাঘাট এখনও উৎসবমুখর। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত। ক্যাফেগুলোতে বসে আড্ডা ও সিসা টানার দৃশ্যও চোখে পড়ছে। ইরানি শাসকরা মনে করছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। কিন্তু আমরা তাদের এই কৌশলে মাথা নত করব না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *