ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পক্ষ থেকে আসা পৃথক বিবৃতিতে এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তেহরানের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটন তাদের সামরিক অভিযান শেষ করতে পারে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে দমনের এই অভিযান এখনই শেষ হচ্ছে না। ইহুদিদের পাসওভার উৎসবের প্রাক্কালে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে’ ইসরায়েল তার সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে। দুই মিত্র দেশের শীর্ষ নেতার এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে নতুন এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্ত করার জন্য ইরানের সঙ্গে সফল কূটনীতি বা কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো বাধ্যতামূলক নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই ফিরে আসব, হয়তো দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যেই।’
এর আগে ট্রাম্প ইরানকে ১৫ দফা যুদ্ধবিরতির শর্ত দিয়েছিলেন, যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ উন্মুক্ত রাখার দায়িত্ব এখন সেই সব দেশগুলোর যারা এটি ব্যবহার করে, একা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। মিত্র দেশগুলো এই যুদ্ধে পর্যাপ্ত সহায়তা না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে ‘নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ করে নেওয়ার’ পরামর্শ দিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনার বিপরীতে নেতানিয়াহু তার কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে তারা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছেন এবং ইসরায়েল একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘অভিযান এখনো শেষ হয়নি, আমরা আমাদের মিশনে অটল থাকব।’ উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যৌথভাবে এই যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর থেকেই পুরো অঞ্চলে একের পর এক প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হয়। তবে যুদ্ধের শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, নেতানিয়াহুই মূলত ট্রাম্পকে এই অভিযানে প্ররোচিত করেছিলেন।
সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি উত্তপ্ত ফোনালাপের খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন যে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা অত্যন্ত সহজ হবে, যা বাস্তবে ঘটেনি।
বর্তমানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জানিয়েছেন যে, তার দেশ যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী, যদি শত্রুপক্ষ পুনরায় সংঘাত না ছড়ানোর গ্যারান্টি দেয়। তবে ইসরায়েলের অনড় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান পরিকল্পনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখন আন্তর্জাতিক মহলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি।








