বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

সবশেষ

২৫০ কোটি ডলার ক্ষতির পর ঘুম ভাঙলো ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

পশ্চিম ভারতের পুনে শহরের বাসিন্দা অলোক (ছদ্মনাম)। তিনি পেশায় একজন বিজনেস অ্যানালিস্ট। গত ফেব্রুয়ারিতে একটি টেক্সট মেসেজ পান।

সেখানে বলা হয়, দ্রুত গাড়ি চালানোর জরিমানা হিসেবে তাকে এক হাজার রুপি দিতে হবে।

না দিলে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। ভয় পেয়ে অলোক সঙ্গে সঙ্গে মেসেজের লিঙ্কে ক্লিক করেন এবং টাকা দিতে যান। পেমেন্ট শেষ করতে তাকে একটি ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) দিতে বলা হয়। তিনি সেটিও দিয়ে দেন।
কিন্তু কয়েক মিনিট পরই তার ক্রেডিট কার্ড থেকে সর্বোচ্চ সীমা অনুযায়ী তিন হাজার ২২৫ ডলার কেটে নেওয়া হয়। বুঝতে না পেরে তিনি আসলে জরিমানার চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে ফেলেছিলেন। এটি একটি সাধারণ প্রতারণার কৌশল। এই কৌশলে প্রতারকরা সরকারি ওয়েবসাইটের মতো ভুয়া মেসেজ পাঠিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলে

এই ধরনের প্রতারণাকে বিশেষজ্ঞরা ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলেন। এতে ভয় দেখিয়ে বা তাড়াহুড়া তৈরি করে মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়। গত কয়েক বছরে দেশটিতে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের প্রতারণাও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ মোট ২৫০ কোটি ডলার হারিয়েছেন, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় চার হাজার ৩০০ শতাংশ বেশি।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে।

এই মাসের শুরুতে তারা একটি আলোচনাপত্রে জানিয়েছে, প্রতারণা ঠেকাতে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এই সমস্যা ঠেকাতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)’ কিছু নতুন পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে।এর মধ্যে রয়েছে, এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্তত এক ঘণ্টা দেরি রাখা, যাতে প্রতারণা হলে সময়মতো তা থামানো যায়। এ ছাড়া বয়স্কদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের বড় অংকের ডিজিটাল লেনদেনে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির অতিরিক্ত অনুমোদনের কথাও বলা হয়েছে।

গবেষণাপত্রে আরো বলা হয়েছে, গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে হঠাৎ বড় অংকের টাকা জমা পড়লে তার ওপর সীমা আরোপ ও নিয়মিত পর্যালোচনা করা উচিত, যাতে এসব অ্যাকাউন্ট ‘মিউল’ (অবৈধভাবে টাকা লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত) হিসেবে ব্যবহার না হয়।

এ ছাড়াও ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মতো ডিজিটাল পেমেন্ট চালু বা বন্ধ করা এবং লেনদেনের সীমা ঠিক করার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (আরবিআই) এই পদক্ষেপগুলো ভালো উদ্যোগ হলেও, এগুলোর প্রভাব খুব বেশি নাও হতে পারে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হওয়ার আগে জনমত নেওয়া হলেও বাস্তবে এগুলো সব ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, টাকা পাঠাতে এক ঘণ্টা দেরি করার নিয়মটি অলোকের মতো ওটিপি প্রতারণা ঠেকাতে কিছুটা কাজে আসতে পারে। তবে এই ধরনের প্রতারণায় ক্ষতির পরিমাণ মোট জালিয়াতির তুলনায় খুবই কম।

আরবিআই-এর ইনোভেশন হাবের সাবেক সিইও রাজেশ বনসাল বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে এই ধরনের প্রতারণাই বেশি ছিল। কিন্তু এখন জালিয়াতি আরো জটিল হয়েছে এবং ভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নতুন নিয়ম বাস্তবে চালু করা সহজ হবে না। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক  রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া  (আরবিআই)-এর প্রস্তাব নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। নিয়ন্ত্রক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আইডিফাই ঋজু রায় বলেন, টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার বিলম্ব চালু করা কঠিন। কারণ একটি পেমেন্টে অনেক পক্ষ জড়িত থাকে। তাই পুরো সিস্টেম না বদলে এটি কার্যকর করা সহজ নয়।

আরবিআইও তাদের আলোচনাপত্রে স্বীকার করেছে, এই বিলম্ব চালু করতে হলে পুরো পেমেন্ট ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন লেনদেন আটকে রাখা (কিউয়িং) থেকে শুরু করে বাতিল করার প্রক্রিয়া পর্যন্ত। এতে অনেক খরচ ও পরিশ্রম লাগবে।

এ ছাড়া এই ব্যবস্থা ডিজিটাল পেমেন্টের দ্রুততার মূল ধারণার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে। আরবিআই-এর সাবেক কর্মকর্তা রাজেশ বনসাল বলেন, ‘এটা অনেকটা এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়ে বারবার স্পিড ব্রেকার বসানোর মতো।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে খুব বেশি লাভ নাও হতে পারে। কারণ প্রতারকরা নতুন পথ খুঁজে নিতে পারে। যেমন, তারা গ্রাহককে আগে থেকেই অপেক্ষা করতে বলবে, যাতে বিলম্বের সময় পার হয়ে যায় এবং সন্দেহ না হয়। অন্যদিকে, বয়স্কদের জন্য ‘বিশ্বস্ত ব্যক্তি’ দিয়ে যাচাই করার প্রস্তাবও কিছু প্রশ্ন তৈরি করছে।

যদি সেই ব্যক্তি বিদেশে থাকেন, তাহলে কীভাবে যাচাই হবে? আর যদি তিনি ভুল করে প্রতারণামূলক লেনদেন অনুমোদন করেন, তাহলে দায় কার হবে, এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মিউল’ (অবৈধ লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত) অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে ক্রেডিট সীমা নির্ধারণ ও কঠোর যাচাই বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যকর হতে পারে। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে অনেক খরচ ও সম্পদের প্রয়োজন হবে। আইডিফাইয়ের ঋজু রায় বলেন, শেষ পর্যন্ত এই খরচ গ্রাহকদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে রাজেশ বনসাল বলেন, এই সমস্যা মোকাবিলায় রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কাছে ইতিমধ্যেই ‘মিউলহান্টার ডট এআই’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যা সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন সিইও ছিলাম তখনই এটি তৈরি করা হয়। এটিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা দরকার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এখনো তা করা হয়নি।’ তিনি দ্রুত এই প্রযুক্তি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল থেকে সমাধান করতে হলে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুলিশ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাজার নিয়ন্ত্রক ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *