সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

সৌদিতে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা কোথায়? ৯ মাসে নির্যাতিত হয়ে ফিরেছেন ৯৭৯ জন

বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আনার স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন শিলা বেগম ও জাহানারা বেগম। কিন্তু কর্মস্থলে নির্যাতন ও অনিরাপদ পরিবেশের অভিযোগ নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে তাদের। এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া নারী কর্মীদের সংখ্যা কত, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই সরকারের কাছে। তবে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী। তাদের মধ্যে ৯৭৯ জনই সৌদি আরব থেকে এসেছেন, যা মোট সংখ্যার ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি বাংলাদেশকে আগে জানানো হয়নি বলে জানা গেছে। একদিকে নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যদিকে সৌদি আরবের শ্রমবাজারের ওপর বাংলাদেশের বড় ধরনের নির্ভরতা মিলিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়িয়ে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নারী কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, গৃহকর্মের বাইরে নতুন খাতে কাজের সুযোগ তৈরি এবং বিদেশে তাদের বসবাস ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

কাজের সন্ধানে গিয়ে ফিরতে হচ্ছে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে
ভাইবোনের খরচ জোগাতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান সাভারের শিলা বেগম। কাজ করতেন এক সৌদি নাগরিকের বাড়িতে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত এপ্রিলে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

শিলার অভিযোগ, বাড়িতে দিন-রাত কাজ করানো হতো। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না, ঘুমাতে হতো রান্নাঘরে। বাড়ির বাইরে যাওয়ারও সুযোগ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসতে নিজেকেই টাকা জোগাড় করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

শিলার ভাষায়, কর্মস্থলে তার জীবন বন্দিদশার মতো হয়ে উঠেছিল। পরিবারের জন্য আয় করতে বিদেশে গেলেও সেখানকার পরিবেশে টিকে থাকতে পারেননি তিনি।

দোহার এলাকার জাহানারা বেগমের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ও বিচ্ছেদের পর ভাইদের পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তিনি। নিজের সম্পদ বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ভালো থাকার আশায়।

কিন্তু জাহানারার অভিযোগ, তার নিয়োগকর্তা তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। রাজি না হওয়ায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। শেষ পর্যন্ত সেই পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

শিলা ও জাহানারার অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেই একজন নারী নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বুঝতে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের তথ্য, অভিযোগের ধরন এবং প্রতিকার পাওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।

সৌদি আরব থেকেই ফিরেছেন অর্ধেকের বেশি
বিদেশ থেকে ফিরে আসা সব কর্মীর পূর্ণাঙ্গ হিসাব সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে নেই। তবে যেসব কর্মী আউটপাস নিয়ে দেশে ফেরেন, বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক তাদের তথ্য সংরক্ষণ করে।

ডেস্কের আউটপাস প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী আউটপাসের মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ৯৭৯ জন, জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন ফিরেছেন।

শুধু সৌদি আরব থেকেই আসা নারী কর্মীর সংখ্যা মোট হিসাবের ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ আউটপাসে ফিরে আসা নারী কর্মীদের বড় অংশের গন্তব্য ছিল এই একটি দেশ।

মাসভিত্তিক হিসাবেও দেশে ফেরার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য ওঠানামা রয়েছে। জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন।

সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব থেকে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন নারী কর্মী ফিরেছেন।

তবে এই পরিসংখ্যানকে বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারী কর্মীদের মোট সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। আউটপাসের হিসাব মূলত একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরার তথ্য তুলে ধরে। নিয়মিত ফ্লাইটে ফিরে আসা কর্মী, অন্য প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরা নারী এবং অভিযোগ না জানানো ভুক্তভোগীদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এতে রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

কেন দেশে ফিরছেন নারী কর্মীরা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়া, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারা, শারীরিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক জটিলতা ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা দেশে ফেরেন।

দেশে ফিরে আসা অনেক নারী কর্মী কর্মস্থলে নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সৌদি আরবে নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবের কারণে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীদের দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে কতটি ঘটনায় তদন্ত হয়েছে, কতজন কর্মী ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কিংবা অভিযুক্ত নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম, ওকাপের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশ বিদেশে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ৮২ শতাংশ কর্মীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।

এই গবেষণার তথ্য দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুতর চিত্র তুলে ধরে। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ও নমুনা নির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য ছাড়া এসব হারকে বিদেশে কর্মরত সব বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসাব হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা ঘিরে কূটনৈতিক তদারকির প্রশ্ন
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা।

প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার মক্কার মসজিদ এলাকা-সংক্রান্ত একটি ঘটনায় ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে বাংলাদেশকে অবহিত করেনি বলে জানা গেছে।

গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। বৃহস্পতিবার জেদ্দার পররাষ্ট্র দপ্তরে চিঠিটি পাঠানো হয়।

এরপর রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) নজরুল ইসলাম বৈঠকে রাষ্ট্রদূতের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে সৌদি সরকারের কাছে আগে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি অনুলিপি রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘিরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তদারকি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট দুই নাগরিকের আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ কতটা ছিল এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

নারী কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে এ ঘটনাকে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই। তবে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, আইনি সহায়তা এবং সংকটের সময় কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমবাজার বাড়লেও সৌদির ওপর নির্ভরতা কমেনি
বাংলাদেশ বিদেশে কর্মী পাঠানোর গন্তব্য বাড়ানোর চেষ্টা করলেও সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা এখনো উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অদক্ষ কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশটি বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলোর একটি।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন গেছেন সৌদি আরবে, যা মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

চলতি বছরে বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন কর্মী। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনের গন্তব্য সৌদি আরব।

এই তথ্য বাংলাদেশের বিদেশি শ্রমবাজারে একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরে। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে সেই বাজারের কর্মপরিবেশ, নিয়োগব্যবস্থা কিংবা নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাবও বড় পরিসরে পড়তে পারে। একই সঙ্গে গৃহকর্মের মতো খাতে নারী কর্মীদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করে দেওয়াও সহজ সমাধান নয়। অনেক নারী আর্থিক সংকট, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা জীবিকার তাগিদে বিদেশে যান। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে হঠাৎ কোনো বাজার বন্ধ করে দিলে তাদের আয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।

গৃহকর্মের বাইরে নতুন খাত তৈরির তাগিদ
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমাতে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা চালু করা হয়েছে। সৌদি আরবেও সেফ হোম রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানো বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। সরকারের চেষ্টা হচ্ছে নিয়মিত ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

ওই কর্মকর্তা উগান্ডার নারী গৃহকর্মীদের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তারা সৌদি আরবে গিয়ে নিয়োগকর্তার বাড়িতে না থেকে ডরমিটরিতে থাকেন। পাশাপাশি চুক্তিপত্রে কী লেখা রয়েছে, কাজের সময়, বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও তাদের ধারণা থাকে। বাংলাদেশের নারী কর্মীদের ক্ষেত্রেও চুক্তির শর্ত বোঝানো এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, বাংলাদেশের নারী কর্মীদের জন্য গৃহকর্মের বাইরে বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করা জরুরি। তিনি বলেন, জর্ডানে বাংলাদেশি নারীরা তৈরি পোশাক খাতে কাজ করছেন। সৌদি আরবেও এ ধরনের বিকল্প কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য খাত সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজতে হবে।

তার মতে, শুধু তৈরি পোশাক নয়, নির্মাণশিল্পসহ বিভিন্ন কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক কাজেও নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে নারীরা প্রচলিত গৃহকর্মের বাইরে অন্যান্য পেশায় প্রবেশ করতে পারেন।

আসিফ মুনীর বলেন, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক নারী নিয়োগকর্তার বাড়িতেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। ফলে তাদের চলাচল, অন্য কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, কর্মীরা যদি ডরমিটরি বা হোস্টেলে থেকে কাজ করতে পারেন, তাহলে সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

তিনি মনে করেন, গৃহকর্মী পাঠানোর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তবে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না করে হঠাৎ শ্রমবাজার বন্ধ করা ঠিক হবে না। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট সরকার এবং বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নারী কর্মীদের নিরাপদ আবাসন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

শুধু প্রশিক্ষণ নয়, জবাবদিহিও জরুরি
বাংলাদেশ ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠানো শুরু করে। নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার পর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোর চুক্তি হয়। এরপর থেকে দেশটিতে বাংলাদেশি নারী কর্মী পাঠানো হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের অভিযোগের কারণে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করার আলোচনাও হয়েছে।

কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ ওঠার পরও সমস্যার প্রকৃত মাত্রা ও প্রতিকার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন। আউটপাসে দেশে ফেরা কর্মীদের সংখ্যা জানা গেলেও নিয়মিতভাবে ফিরে আসা কর্মীদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ, চুক্তিপত্রের শর্ত বোঝানো, নিয়োগকর্তা ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের যাচাই এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিদেশে যাওয়ার পর অভিযোগ জানানোর সহজ পথ, নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও কার্যকর থাকতে হবে।

একই সঙ্গে গৃহকর্মের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়ন কতটা এগোচ্ছে, নারী কর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং নির্যাতনের অভিযোগে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি।

নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা কিংবা শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা, কোনোটিই এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিরাপদ অভিবাসনের জন্য কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা ৯৭৯ নারী কর্মীর পরিসংখ্যান সেই প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *