শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৫

সবশেষ

মরুভূমির জাহাজ উটের আশ্চর্য সব ক্ষমতা

উট প্রকৃতির বিস্ময়গুলোর অন্যতম একটি প্রাণী। এটি ৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থেকে শুরু করে মাইনাস ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। সে জন্যই এটিকে মরুর জাহাজ বলা হয়।

তারা তপ্ত মরুভূমিতে হেঁটে চলতে পারে আর দীর্ঘ সময় পানি ছাড়াই বাঁচতে পারে! উট দীর্ঘ সময় ধরে প্রখর সূর্যের নিচে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর ওপর চলাফেরা করতে পারে। এটি মাসের পর মাস পানি পান না করেও বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি বড় কাঁটাযুক্ত ক্যাকটাসও সহজেই খেয়ে ফেলে। উটের পিঠে প্রায় দেড়শ কেজি ওজন বোঝাই করেও এটি শত শত মাইল পাড়ি দিতে পারে। এর এই অনন্য শারীরিক গঠন ও ক্ষমতা প্রাণীবিজ্ঞানীদের কাছে এক বিস্ময়!

অন্য প্রাণীরা উটের মতো প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে না। প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার মধ্যে মানুষও রয়েছে, তাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। যদি তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ৩৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যায়, তাহলে তাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

যদি তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তাহলে লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্র গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে শরীরের কোষগুলো মারা যেতে শুরু করে। এ কারণেই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীর অতিরিক্ত তাপমাত্রা কমানোর জন্য ঘাম ঝরিয়ে শরীরকে শীতল রাখে। কিন্তু মরুভূমিতে পানি পাওয়া কঠিন, তাই উটের শরীরে বিশেষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে।

উটের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ক্ষমতা সম্পর্কে আমরা জানি। সকালে উটের শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। তারপর দিনের বেলায় যখন আবহাওয়া খুব গরম হয়ে যায়, তখন তার শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। তবুও এটি খুব কম ঘাম ঝরায়, ফলে শরীরে পানির ঘাটতি হয় না।

উট প্রতিদিন উচ্চ তাপমাত্রার সম্মুখীন হয়। এটি প্রতিদিন স্বাভাবিক থেকে উচ্চমাত্রার জ্বরের মতো তাপমাত্রা সহ্য করে। তাদের শরীরের ভিতরে এমন ব্যবস্থা রয়েছে যা প্রতিদিন এত উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করেও তাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে রক্ষা করতে সক্ষম।

উটের রক্তে প্রচুর পানি থাকে
উটের রক্তের মধ্যে উচ্চ পরিমাণে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা রয়েছে। যখন উট পানি পান করতে শুরু করে, তখন এটি মাত্র ১০ মিনিটে প্রায় ১৩০ লিটার পানি পান করতে পারে, যা প্রায় তিনটি জ্বালানি ট্যাংকের পানির সমপরিমাণ। অন্য কোনো প্রাণী যদি এত বেশি পানি একসঙ্গে পান করে, তাহলে তাদের রক্তে অতিরিক্ত পানি প্রবেশ করবে, যা তাদের রক্তকণিকাগুলোকে ফাটিয়ে দেবে। কিন্তু উটের রক্তকণিকার গঠন এমনভাবে তৈরি যে এটি উচ্চ চাপ সহ্য করতে পারে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য উটকে একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে সহায়তা করে।

উটের কুঁজ শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখে

উটের কুঁজ আসলে চর্বির সঞ্চয়স্থান, যা তাদের জন্য শক্তি ও পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করে। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার ও পানি সঞ্চিত থাকার পর, উট ছয় মাস পর্যন্ত পানি ও খাবার ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে। উটকে মরুভূমির জাহাজ বলা হয়। তারা ১৮০-২৬০ কেজি ওজনের হতে পারে এবং সবসময় একটি প্রশান্ত ভাব নিয়ে পথ চলতে পারে। এত বড় ও শক্তিশালী প্রাণী হয়েও এটি অত্যন্ত শান্ত ও বিশ্বস্ত।

উট একটি স্বাধীনচেতা প্রাণী, এটি চাইলে হিংস্র হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে এটি মানুষের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত থাকে, যা তথাকথিত বিবর্তনবাদের নিয়মকানুন ভেঙে দেয়।

কোরআনে উটের কথা
যদি আল্লাহ উটকে মানুষের উপযোগী করে সৃষ্টি না করতেন, তাহলে মরুভূমিতে কোনো সভ্যতা গড়ে উঠতে পারত না। আল্লাহ তাআলা কোরআনে উটের এই বিস্ময়কর ক্ষমতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। উট সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে বর্ণনা পাওয়া যায়। উট কাটাযুক্ত গাছপালা চিবিয়ে খেতে পারে, যা অন্য কোনো প্রাণী পারে না। অন্য কোনো প্রাণী যদি কাটাযুক্ত ক্যাকটাস খাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের মাড়ি, গাল ও জিহ্বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু উটের মুখের ভিতরে বিশেষ গঠন রয়েছে। এটির মুখের ভিতরে অসংখ্য ছোট ছোট শক্ত আঙুলের মতো অংশ রয়েছে, যা তাদের কাটাযুক্ত খাদ্য থেকে রক্ষা করে।

উটের চোখ বিশেষভাবে সুরক্ষিত। উটের চোখে দুটি স্তরের পাতা রয়েছে। এই বিশেষ গঠন মরুভূমির ধুলিঝড়ের মধ্যেও তাদের চোখ খোলা রাখতে সাহায্য করে। এটি সূর্যের প্রচণ্ড তাপ থেকেও চোখকে সুরক্ষিত রাখে এবং আর্দ্রতা বজায় রাখে। এছাড়া, উটের চোখের পাতা বাঁকানো থাকে, যা ধুলাবালি আটকে রাখে এবং চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ রাখে।

উট প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, যার দেহগঠন ও ক্ষমতা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। এটি শুধু মরুভূমিতে টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে তৈরি নয়, বরং এটি মানুষের জন্য এক আশ্চর্য দান। উটের শারীরিক গঠন, আচরণ ও অসাধারণ সহনশীলতা আমাদের আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও শক্তির প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়।

সূত্র: ইসলামিক ইনফরমেশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *