শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৫

সবশেষ

কঠোর না হলে ঠেকানো যাবে না

আল আমিন নয়ন

রাতের আঁধারে অচেনা শহরের একটি বদ্ধ কামরায় কয়েকজন যুবক নীরব আতঙ্কে বসে আছেন। তাঁদের চোখে ভয়, শরীর ক্লান্ত, মনে অজানা আশঙ্কা। তাঁরা বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন একটি স্বপ্ন নিয়ে ভালো চাকরি পাবেন, পরিবারের দারিদ্র্য মোচন হবে। কিন্তু এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, তাঁরা পাচারকারীর ফাঁদে পড়েছেন।

পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে, খাবার সীমিত, আর তাঁদের বলা হয়েছে ‘যুদ্ধে নামতে হবে, নয়তো মরতে হবে।’

এটি শুধু গল্প নয়, বরং বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ায় মানবপাচারের এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশি তরুণদের সেনা ক্যাম্পে ক্লিনার, কুক বা বিভিন্ন পেশায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন।

অনিচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাচারের প্রবণতা এখন আরো বাড়ছে।

গত কয়েক মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশি নাগরিকরা রাশিয়ায় যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ, বিশেষ করে দুবাই ও সৌদি আরবের মাধ্যমে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

প্রলোভন দেখানো হচ্ছে তাঁদের ভালো চাকরি দেবে। কিন্তু পরে জানা যাচ্ছে তাঁরা সেনা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। যাঁরা যুদ্ধ করতে রাজি হচ্ছেন না, তাঁদের ওপর চালানো হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। পাচারকারীরা মাসে দুই-তিন লাখ টাকা বেতনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় লোক পাঠাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ভুক্তভোগীরা সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

অবৈধ চক্রের মাধ্যমে পাঠানো লোকেরা কোনো কূটনৈতিক সুরক্ষা পান না, ফলে তাঁরা বিপদের মুখে পড়লে ফিরে আসার সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা তাঁদের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো দেশে, যেখানে কূটনৈতিক সহায়তা সীমিত, সেখানে পাচার হওয়া মানুষের জন্য বেঁচে থাকা আরো কঠিন। এই সমস্যা শুধু একজন ভুক্তভোগীর নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি বড় সংকট।

রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী প্রেরণের পূর্বে কর্মী গ্রহণকারী দেশের কম্পানি বা নিয়োগকর্তা ডিমান্ড লেটার ইস্যু করবেন। সেই ডিমান্ড লেটার অনুযায়ী নিয়োগকর্তার সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশ দূতাবাস এটি সত্যায়ন করবে। কিন্তু বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি নিযুক্তকারী দেশের ডিমান্ড লেটার ছাড়াই কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করছে, যা আইনের পরিপন্থী। এভাবে বিদেশগামীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা পাসপোর্ট রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে রেখে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, এটি পুরোপুরি বে-আইনি।

আমার মতে, পাচার রোধে আমাদের তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে— সচেতনতা বৃদ্ধি : মানুষকে বুঝতে হবে যে বিদেশে যাওয়ার আগে ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর নজরদারি : পাচারকারী চক্র যাতে অবৈধভাবে সহজে মানুষকে বিদেশে পাঠাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। ভুক্তভোগীদের সহায়তা ও পুনর্বাসন : যাঁরা পাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসেন, তাঁদের জন্য পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।

রাশিয়ায় মানবপাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি হাজারো তরুণের স্বপ্নভঙ্গ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যাঁরা ভালো ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে যান, তাঁরা যেন প্রতারণার শিকার না হন সে জন্য সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, যদি সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়, পাচারকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা যায়, আর রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আমরা মানবপাচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারব।

লেখক : ট্রাফিকিং এন পারসন্স (টিআইপি) হিরো ও মানবপাচারবিরোধী কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *