ইতালির পেস্কারা ও আবরুৎসো অঞ্চলে কয়েক মাস ধরে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল একটি রহস্যময় মানবপাচার চক্র। অভিবাসন দপ্তর, পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট আর স্থানীয় প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তারা শত শত মানুষকে অদৃশ্য পথ দিয়ে ইতালিতে ঢোকাচ্ছিল। দীর্ঘ নজরদারি, গোপন তথ্য আর কয়েকটি অস্বাভাবিক আবেদন—সব মিলিয়ে যখন সন্দেহ ঘনীভূত হলো, তখনই শুরু হয় বিশেষ অভিযান।
সেই অভিযানে ধরা পড়ল কেন্দ্রীয় চরিত্র—মাহবুব আহমেদ (৪৫)। ৩ নভেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও, চক্রের কার্যকলাপ এতটাই জটিল ও গভীর ছিল যে পুরো তথ্য প্রকাশে সময় লেগেছে প্রায় তিন সপ্তাহ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি বিষয়টি প্রকাশ করলে পুরো কমিউনিটিতে শুরু হয় তীব্র আলোড়ন। মাহবুবের গ্রামের বাড়ি সিলেটে। তিনি নিজেকে পেস্কারা বিএনপির আহ্বায়ক দাবি করলেও এ বিষয়ে দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি—যা রহস্য আরও ঘনীভূত করছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চক্রটি ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’—ইতালির বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া—ব্যবহার করেই তৈরি করত নিখুঁত ভুয়া জব কনট্রাক্ট ও নথি। এদের তৈরি কাগজপত্র এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, প্রথমদিকে কেউ টেরই পায়নি—একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট আস্তে আস্তে ইতালিতে অনুপ্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে শত শত বাংলাদেশিকে। প্রতিটি ফাইল থেকে আদায় করা হতো বিপুল অর্থ। হিসাব কষে দেখা গেছে, চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত ৩ মিলিয়ন ইউরো—বাংলাদেশি টাকায় ৩৬ কোটি টাকারও বেশি।
আরও পড়ুনঃ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছালেন প্রথম দফার ৬০ কর্মী
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। তদন্তে উঠে এসেছে হুমকি, ভয়ভীতি, অর্থ আদায়, এমনকি ডাকাতির মতো অভিযোগও। আরও অস্বস্তিকর তথ্য—চক্রটির সাথে যুক্ত ছিল কিছু ইতালীয় অসাধু ব্যবসায়ীও। তারা ভুয়া কোম্পানির নামে কাগজপত্র প্রস্তুত করত ‘ক্লিক ডে’র ফাঁকে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দুই ইতালীয় ব্যবসায়ীকে নথিসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার পরই পুরো চক্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হতে শুরু করে।
এ মামলায় এখন ১৯ জন নজরদারিতে—কে কোন ভূমিকায় ছিল, কে কোথায় লুকিয়ে আছে—সবকিছুই এখন তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা দেক্রেতো ফ্লুসির পুরো সিস্টেমকে আরও কঠোর করে দিতে পারে, যেখানে প্রকৃত শ্রমিকদের বৈধ অভিবাসনও ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইতালিস্ত বাংলাদেশি কমিউনিটি বিষয়টি জানার পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেকেই বলছেন—“একজনের লোভ শত মানুষের ভবিষ্যতকে বিপদে ফেলছে।”
তারা দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে সতর্ক করেছেন—এ ধরনের চক্র যে কোনো সময় আবার ছায়ার মতো ফিরে আসতে পারে।








