বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

সবশেষ

ইতিহাসের নীরব নায়ক: কেন আড়ালেই রয়ে গেলেন সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস

ক্ষমাশীলতার ইতিহাস যেমন বলা হয়, তেমনি বলা হয় না প্রতিরোধের ইতিহাস।ইতিহাসের যে অধ্যায় আমাদের বলা হয় না সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস, প্রতিরোধের রাজনীতি এবং আজকের মুসলিম বিশ্ব।

ইতিহাস কেবল অতীতের দলিল নয়—ইতিহাস বর্তমান রাজনীতির ভাষ্য। কে ইতিহাসে নায়ক হবেন, আর কে বিস্মৃত থাকবেন, তা অনেক সময় নির্ধারিত হয় ক্ষমতা, প্রচার এবং বৈশ্বিক বয়ানের মাধ্যমে। ঠিক এই কারণেই ক্রুসেডের ইতিহাসে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ.) সর্বাধিক আলোচিত হলেও, একই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস প্রায় অদৃশ্য।

এই অদৃশ্যতা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত ইতিহাসচর্চার ফল।
ক্ষমাশীলতার ইতিহাস বনাম প্রতিরোধের ইতিহাস
পাশ্চাত্য ইতিহাসচর্চা এমন শাসকদের স্মরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যাঁরা বিজয়ী হয়েও শত্রুকে ক্ষমা করেছেন। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী সেই ধারার প্রতীক। তিনি জেরুজালেম পুনর্দখলের পর খ্রিস্টানদের প্রাণনাশ করেননি—এ কারণেই তিনি পাশ্চাত্যের চোখে “Great Saladin”।

কিন্তু সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস ছিলেন ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিনিধি। তিনি ক্ষমার রাজনীতি করেননি, করেছেন প্রতিরোধের রাজনীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন—বারবার ক্ষমা দিলে আগ্রাসন থামে না, বরং উৎসাহ পায়। তাঁর শাসনামলে ক্রুসেডাররা শুধু পরাজিত হয়নি; তারা মুসলিম ভূখণ্ড থেকে স্থায়িভাবে বিতাড়িত হয়েছে।
এ কারণেই পাশ্চাত্য ইতিহাসে বাইবারস নেই—কারণ তিনি ছিলেন সেই শাসক, যিনি আগ্রাসী শক্তিকে পুনরায় দাঁড়ানোর সুযোগ দেননি।

আইন জালুত: একটি যুদ্ধ, একটি সভ্যতার মোড়
১২৬০ সালের আইন জালুতের যুদ্ধ শুধু মুসলিম ইতিহাসের নয়, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই যুদ্ধেই প্রথমবারের মতো “অপরাজেয়” মঙ্গোল শক্তি পরাস্ত হয়। এই পরাজয় না ঘটলে উত্তর আফ্রিকা, আন্দালুস, এমনকি ইউরোপের অভ্যন্তরও মঙ্গোল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেত না।

এই যুদ্ধের নায়কদের মধ্যে সুলতান কুতুযের নাম যেমন উচ্চারিত হয়, তেমনি রণকৌশল ও বাস্তব নেতৃত্বে সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারসের ভূমিকা ছিল নির্ধারক। অথচ পাশ্চাত্য ইতিহাসে এই যুদ্ধের গুরুত্ব যতটা আলোচিত, বাইবারসের নাম ততটাই আড়াল।
কারণ, তিনি সেই বাস্তবতা ভেঙে দিয়েছিলেন—যে বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্বকে চিরকাল পরাজিত ও প্রতিরক্ষাহীন হিসেবে দেখানো হয়।
আজকের মুসলিম বিশ্ব ও বাইবারসের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের মুসলিম বিশ্বে আমরা কী দেখি?
ফিলিস্তিনে অবিরাম আগ্রাসন,
কাশ্মীরে দমন-পীড়ন,
রোহিঙ্গা মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন জীবন,
ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়ায় ধ্বংসযজ্ঞ।
আর এর বিপরীতে আমরা কী করি?
নিন্দা জানাই, বিবৃতি দিই, জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে থাকি—যেন ইতিহাসে আগ্রাসী শক্তি কখনো নিন্দায় থেমেছে।

সুলতান রুকনউদ্দীন বাইবারস আমাদের মনে করিয়ে দেন—ন্যায় প্রতিষ্ঠা শুধু নৈতিকতার ভাষায় নয়, শক্তির ভাষায়ও হয়। তিনি দেখিয়েছিলেন, প্রতিরোধ যদি সুসংগঠিত, আদর্শভিত্তিক ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক হয়, তবে তা সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে।
বাংলাদেশ ও ইতিহাসবোধের সংকট
বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক, একাডেমিক চর্চা ও জনপ্রিয় ইতিহাসবোধে মুসলিম প্রতিরোধের এই অধ্যায়গুলো প্রায় অনুপস্থিত। আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু শিখি না। আমরা বীরদের নাম জানি, কিন্তু তাদের রাষ্ট্রচিন্তা জানি না।

ফলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেখা যায়—
নীতির কথা আছে, কিন্তু দৃঢ়তার অভাব;
ন্যায়ের দাবি আছে, কিন্তু প্রতিরোধের সাহস নেই।
ইতিহাস যদি কেবল নৈতিক গল্প হয়ে থাকে, তবে তা আমাদের দুর্বল করে। ইতিহাস যদি রাজনৈতিক শিক্ষা হয়ে ওঠে, তবে তা জাতিকে শক্ত করে।
বাইবারস: শুধু একজন যোদ্ধা নন, একজন রাষ্ট্রনায়ক
বাইবারস ছিলেন শুধু যুদ্ধবাজ নন।

তিনি আব্বাসীয় খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন—যা মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক।
তিনি আল-আজহারকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন—যা আজও সুন্নি ইসলামের অন্যতম কেন্দ্র।

তিনি প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা ও কূটনীতিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
একদিকে কঠোর প্রতিরোধ, অন্যদিকে সুশাসন—এই সমন্বয়ই তাঁকে ইতিহাসের ব্যতিক্রমী চরিত্রে পরিণত করেছে।
কেন আজ বাইবারসকে নতুন করে পড়া জরুরি
আজ যখন মুসলিম বিশ্ব কেবল প্রতিক্রিয়াশীল, আত্মরক্ষাহীন ও বিভক্ত—তখন বাইবারস আমাদের মনে করিয়ে দেন, ক্ষমা তখনই অর্থবহ, যখন শত্রু তা অপব্যবহার করতে না পারে।

তাঁকে স্মরণ করা মানে যুদ্ধের বন্দনা নয়;
তাঁকে স্মরণ করা মানে ন্যায়ের প্রশ্নে আপোষ না করার শিক্ষা নেওয়া।
ইতিহাসের এই নীরব নায়ক আমাদের কাছে প্রশ্ন রেখে যান—
আমরা কি শুধু নিন্দা করব,
নাকি প্রতিরোধের ভাষাও শিখব?

  • মোহাম্মাদ সামসুল ইসলাম
    শিক্ষক ও গবেষক
    ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা
    এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *