বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন ও সম্ভাবনার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো বিস্তার, ডিজিটাল সেবা ও সামাজিক সূচকে অগ্রগতির চিত্র; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তে থাকা ব্যয়ের চাপ, অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের বাস্তবতা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন রাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীরা, যাঁদের ওপরই নির্ভর করে প্রশাসন, সেবা, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বেতন কাঠামো বাস্তব জীবনের ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে দ্রুত নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে একান্ত প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক পদক্ষেপ।
পে-স্কেল কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র ও কর্মচারীর মধ্যকার নীরব সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির মূল ভিত্তি হল রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেবে, আর কর্মচারীরা নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও সততার সঙ্গে জনগণের সেবা করবেন। কিন্তু যখন বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকে এবং মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়, তখন এই চুক্তি কার্যতঃ দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবতা হলো, আজ একজন মাঝারি স্তরের সরকারি কর্মচারীর মাসিক আয় দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।
দ্রুত পে স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব শহর ও গ্রাম দুই জায়গাতেই সমানভাবে পড়েছে। সরকারি কর্মচারীরা যেহেতু নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাই বাজারদরের এই উর্ধ্বগতি তাঁদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। এই চাপ শুধু আর্থিক নয়, মানসিকও। আর্থিক অনিশ্চয়তা একজন কর্মচারীর মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও কাজের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে নাগরিক সেবায়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা। আজকের বিশ্বে রাষ্ট্রগুলো মূলত প্রতিযোগিতা করছে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে।
বেসরকারি খাত, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তুলনামূলক বেশি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মেধাবীদের আকৃষ্ট করছে। যদি সরকারি চাকরির বেতন কাঠামো যুগোপযোগী না হয়, তবে মেধাবী তরুণরা সরকারি সেবায় আসতে আগ্রহ হারাবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসন দক্ষতাহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্রুত পে স্কেল বাস্তবায়ন এই বার্তাই দেয় যে রাষ্ট্র তার মানবসম্পদকে গুরুত্ব দেয় এবং মেধার যথাযথ মূল্য দিতে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দুর্নীতি কোনো ব্যক্তিগত চরিত্রগত সমস্যা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। যখন একজন কর্মচারী ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা অনুভব করেন না, তখন নৈতিক চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। দ্রুত পে স্কেল বাস্তবায়ন তাই দুর্নীতি দমনের একটি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। চতুর্থত, সামাজিক মর্যাদা ও কর্মপ্রেরণার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় সরকারি চাকরি ছিল সামাজিক সম্মানের প্রতীক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে খাপ না খাওয়ায় সেই মর্যাদা অনেকাংশে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। কর্মচারীরা যদি মনে করেন যে তাঁদের শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না, তাহলে কাজের প্রতি উৎসাহ কমে যাওয়া স্বাভাবিক। দ্রুত নতুন পে স্কেল কার্যকর করা মানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট স্বীকৃতি কর্মচারীদের অবদান রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এই স্বীকৃতি মনোবল বাড়ায়, দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং সামগ্রিকভাবে প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নত করে। পঞ্চম যুক্তি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে- অনেক সময় বলা হয়, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় বাড়বে।
কিন্তু বিষয়টি কেবল ব্যয়ের হিসাবে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়ে না। সরকারি কর্মচারীরা যখন বেশি আয় করেন, তখন সেই অর্থ বাজারে প্রবাহিত হয়—খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবায়। এতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই অর্থের একটি বড় অংশ কর ও ভ্যাটের মাধ্যমে আবার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরে আসে। অর্থাৎ পে স্কেল বাস্তবায়ন এক ধরনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারে। দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা এখানেই শেষ নয়।
পে স্কেল নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ায়। ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান থাকলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক তৈরি হয়, যা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। দ্রুত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত কর্মচারীদের আস্থা বাড়ায় এবং কাজের পরিবেশকে ইতিবাচক করে তোলে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও সময়সীমা নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত হওয়া জরুরি। সবশেষে বলা যায়, দ্রুত পে স্কেল বাস্তবায়ন কোনো আলাদা সুবিধা নয়, বরং ন্যায্যতার প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার কর্মচারীরা আর্থিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করেন। দক্ষ প্রশাসন, সুশাসন ও উন্নত নাগরিক সেবার জন্য মানবসম্পদে বিনিয়োগ অপরিহার্য।
আজকের বাংলাদেশ যে উন্নয়নের পথে হাঁটছে, সেই পথকে টেকসই করতে হলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমানের দিকে দৃষ্টি দিতেই হবে। দ্রুত পে স্কেল বাস্তবায়ন তাই শুধু সময়ের দাবি নয় এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং যা ভবিষ্যৎ কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
- মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান, পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ই-মেইল: masudbd85@yahoo.com








