বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

আফগানিস্তানকে ৩ শর্ত দিল পাকিস্তান

চীনের মধ্যস্থতায় দেশটির উরুমকিতে চলমান বৈঠকে আফগানিস্তানের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত তুলে ধরেছে পাকিস্তান। চলমান এই আলোচনায় বেইজিং দুই পক্ষকে একটি পাঁচ দফা কাঠামোয় একমত করানোর চেষ্টা করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

 

সলামাবাদের পক্ষ থেকে শুরুতেই যে তিনটি দাবি জানানো হয়েছে, সেগুলো হলো—আফগান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করবে, তাদের সব ধরনের অবকাঠামো ভেঙে দেবে এবং এসব পদক্ষেপের যাচাইযোগ্য প্রমাণ দেবে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে পাকিস্তানের এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর এখন পর্যন্ত কেবল সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানিয়েছে যে উরুমকিতে আলোচনা চলছে, তবে আলোচনার অগ্রগতি বা এজেন্ডা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, এই বৈঠকে অংশগ্রহণকে নীতিগত কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখা যাবে না, বিশেষ করে চলমান সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে।

 

তিনি আরও বলেন, ‘গত সপ্তাহে যে ‘অপারেশন গাজাব লিল হক’-এর কথা বলেছিলাম, তাতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।’

 

অন্যদিকে, আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি জানিয়েছেন, আলোচনা এখনো চলছে এবং তালেবান সরকার আলোচনার মাধ্যমেই পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে চায়।

 

সূত্রগুলো জানায়, চীন নীরবে কিন্তু সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। আফগানিস্তানবিষয়ক চীনের বিশেষ দূত ইউয়ে শিয়াওইয়ং গত কয়েক মাস ধরে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে পার্থক্য কমাতে শাটল কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

পাকিস্তান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই আলোচনার পরিধি সন্ত্রাস দমন ও সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনায় আপাতত তারা যেতে চায় না। ইসলামাবাদের মূল লক্ষ্য আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা এবং সীমান্তপারের হামলা প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

 

আলোচনায় একটি সম্ভাব্য রোডম্যাপ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে যুদ্ধবিরতি, তালেবানের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী নিশ্চয়তা, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী ঘাঁটি ধ্বংস এবং নিরাপদ বাণিজ্য রুট চালুর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ কাঠামো গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

 

দুই পক্ষই কারিগরি পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে, যা আলোচনার কার্যকরী দিককে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাইয়েদ আলী আসাদ গিলানি, আর তালেবান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহিবুল্লাহ ওয়াসেক।

 

প্রাথমিক আলোচনা শুরু হলেও, সরাসরি কাঠামোবদ্ধ সংলাপে যাওয়ার আগে চীনা কর্মকর্তারা দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা করছেন।

 

বিশ্লেষকদের মতে, শিনজিয়াং অঞ্চলে অবস্থিত উরুমকিকে বৈঠকের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই অঞ্চলে ইস্ট তুর্কেস্তান ইসলামিক মুভমেন্টের মতো জঙ্গি সংগঠন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন বেইজিং, যাদের সদস্যদের আফগানিস্তানে উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

 

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আলোচনা পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক স্থিতিশীল করার একটি সতর্ক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। তবে বড় ধরনের অগ্রগতি নির্ভর করবে কাবুল কতটা আন্তরিকভাবে ইসলামাবাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *