যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম। তবে এই বিতর্ক কেবল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ঘিরে নয়; বরং এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে থাকলেও নেতানিয়াহুকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ককে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চাইছেন।
সম্প্রতি মামদানি ঘোষণা দেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে এ অবস্থান থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এর পরপরই ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কোনোভাবেই নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই প্রতিক্রিয়া কেবল একজন মিত্র নেতাকে রক্ষার চেষ্টা নয়। বরং তিনি এমন একটি বিতর্ককে সামনে আনতে চাইছেন, যার মাধ্যমে ডেমোক্রেটিক পার্টিকে সাধারণ ভোটারের কাছে অতিরিক্ত বামপন্থী ও চরম অবস্থানের দল হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে মামদানির জন্যও এই ইস্যুটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্ক টাইমসের এক পডকাস্টে তিনি বলেন, তার মতে নেতানিয়াহুর স্থান হওয়া উচিত দ্য হেগে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অভিযোগের কারণে তিনি তাকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচনা করেন। তার দাবি, এই অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত নয়; বরং ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন প্রজন্মের অনেক নেতা ও সমর্থকের মনোভাবের প্রতিফলন।
যদিও বাস্তবে নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে মামদানি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট আইনি জটিলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র রোম সংবিধির সদস্য নয়। ফলে আইসিসির পরোয়ানা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতাও দেশটির নেই। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নিতে বিভিন্ন দেশের বিতর্কিত নেতাদের নিউইয়র্কে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই মূল বিষয়টি আইনি নয়, বরং রাজনৈতিক। কারণ, উভয় পক্ষের জন্যই এই বিতর্ক চালিয়ে যাওয়াটাই বেশি লাভজনক। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, নেতানিয়াহু ইস্যু এখন সেই আলোচনাকেও ছাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বড় ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেও এ প্রশ্নে বিভক্তি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল নেতারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে দলের মধ্যপন্থী নেতারা মনে করছেন, অতিরিক্ত ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান রাজনৈতিকভাবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট সিনেটরপ্রার্থী আবদুল আল-সায়েদ সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি চান যুক্তরাষ্ট্রের করের অর্থ বিদেশে যুদ্ধের পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে ব্যয় করা হোক।
একই সময়ে ডেমোক্র্যাট নেতা স্টিভেন্স বলেন, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি জনগণেরই শান্তিতে বসবাসের অধিকার রয়েছে। তবে তার মতে, নেতানিয়াহুর নীতি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের ইহুদিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
অন্যদিকে ইসরায়েল বরাবরের মতোই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির দাবি, হামাসের হামলার পর আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা অভিযান চালাচ্ছে এবং বেসামরিক হতাহতের জন্য হামাসই দায়ী। বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনই এ পর্যন্ত ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
ট্রাম্প ও মামদানির সম্পর্কও এখন নতুন এক পরীক্ষার মুখে। গত বছর ওভাল অফিসে তাদের বৈঠক ছিল বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ। এমনকি চলতি বছরের শুরুতেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মামদানির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো এবং তাদের মধ্যে একাধিক ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। পরে নিউইয়র্কের আবাসন খাতে কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়ে মামদানি আবারও হোয়াইট হাউসে যান।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্পর্ক দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। বয়স, আদর্শ ও ব্যক্তিত্বে ভিন্ন হলেও দুজনের মধ্যে একটি মিল রয়েছে। দুজনই নিজেদের সমর্থকদের আকৃষ্ট করতে প্রতীকী রাজনৈতিক ইস্যু ব্যবহার করতে দক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য মামদানিকে সামনে এনে পুরো ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিচ্ছবি তৈরি করা সহজ হবে। অতীতে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ কিংবা বার্নি স্যান্ডার্সকে ঘিরেও একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছিলেন তিনি।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়ানো মামদানির জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিচিতি আরও বাড়াতে পারে। ফলে নেতানিয়াহুকে ঘিরে এই বিতর্ক উভয় পক্ষের কাছেই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠছে।
সামনের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনীতি নিয়ে জনঅসন্তোষে চাপে রয়েছেন ট্রাম্প। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যদি তিনি ইসরায়েল, অভিবাসন বা সাংস্কৃতিক বিভাজনের মতো ইস্যুকে নির্বাচনের কেন্দ্রে আনতে পারেন, তাহলে নির্বাচনী হিসাব বদলে যেতে পারে।
ইসরায়েল ইস্যুতে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত অবস্থান অটুট থাকলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্য ট্রাম্পের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে এ বিতর্ক ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত দুই দলের নীতিগত অবস্থান ও নেতৃত্বের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
নেতানিয়াহুকে ঘিরে যে রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিতর্ক নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি, দলীয় বিভাজন এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলের অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।








