উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনা দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক আশঙ্কা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ইরানের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মোজতবা খামেনি কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, দূর দেশ থেকে যারা এই অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করছে, তাদের জন্য নিরাপদ কোনো স্থান থাকবে না, জলপথের গভীর তলদেশই হবে তাদের একমাত্র গন্তব্য।
এদিকে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অবরোধ বা বিঘ্ন যদি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। তার ভাষায়, “এই ধমনির মতো গুরুত্বপূর্ণ পথ যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তত কঠিন হয়ে উঠবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের সামরিক অভিযান পরিচালনার ৬০ দিনের সময়সীমা শুক্রবার শেষ হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই সময়সীমা শেষ হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পরিপ্রেক্ষিতে আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘শত্রুতা শেষ হয়েছে’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে সময়সীমা পার হলেও সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের অর্থনীতিকে “বিপর্যস্ত” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে দ্রুত নতজানু করা সহজ হবে না। চলমান সংঘাত ইরানের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে ঠিকই, তবে দেশটি এখনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের জ্বালানি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
সংঘাতের সময় ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের জাহাজ ছাড়া প্রায় সব ধরনের নৌযান চলাচল সীমিত করে দেয়। একই সঙ্গে তারা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নতুন সামরিক কৌশল উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। সম্ভাব্য পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে স্থলবাহিনী ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালির একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং তা পুনরায় বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা। পাশাপাশি নৌ অবরোধ আরও জোরদার করা বা একতরফাভাবে ‘বিজয় ঘোষণা’ করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ১ মে’র মধ্যে মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে একটি নতুন জোট গঠনের আহ্বান জানানো হবে। প্রস্তাবিত জোটের নাম ‘মেরিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’, যার লক্ষ্য হবে ওই জলপথে নিরাপদ বাণিজ্যিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ এ ধরনের উদ্যোগে আগ্রহ দেখালেও তারা জানিয়েছে, সংঘাত পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরাসরি কোনো পদক্ষেপে অংশ নেবে না।
এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। দেশটির একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে বার্তা আদান-প্রদান চলছে, যা সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।








