বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) করদাতাদের কাছে ভয় বা হয়রানির প্রতিষ্ঠান নয়, বরং আস্থার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করে বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার পরিবেশ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকাংশেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজস্ব প্রশাসনকে দক্ষ ও টেকসই করার পাশাপাশি জনগণের আস্থাও অর্জন করতে হবে।

‘ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে ঘুরে দাঁড়ানোর পালা’
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রভাব থেকে এনবিআরও মুক্ত থাকতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তার অভিযোগ, অতীতে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এতে এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। এ সময় তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা, বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’

কর আদায়ের ধরন বদলানোর তাগিদ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক কর ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু বেশি পরিমাণে কর আদায় নয়; বরং বেশি সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো টেকসই পদ্ধতি নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বরং যাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে নিয়মের আওতায় আনার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

কর ব্যবস্থাপনা ও আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষ যেন স্বেচ্ছায় ও স্বাচ্ছন্দ্যে কর দিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসনের বিকল্প নেই
দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও এখনো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। ফলে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।

এ জন্য আধুনিক ও ডিজিটাল ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, করযোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের যথাযথভাবে করের আওতায় আনতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলানোর নির্দেশ
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন এবং নতুন প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন বদলে যাচ্ছে, নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি হচ্ছে এবং কর ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

ডিজিটাল ইকোনমি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, ট্রেড ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, মানি লন্ডারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থার ওপর জোর
ভ্যাটকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার পাশাপাশি এর জটিলতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, কাস্টমস, ভ্যাট বা আয়কর আদায় কেবল জোর প্রয়োগের বিষয় নয়। করদাতাদের মধ্যে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ আরও সহজ হয়।

এনবিআরকে এমনভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি, যাতে মানুষ প্রতিষ্ঠানটিকে ভয় না করে বরং বিশ্বাস করে।

‘ব্যক্তি স্বার্থের আগে দেশের স্বার্থ’
রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে এনবিআরকে আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নতুন বাংলাদেশ গড়তে সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যার অস্তিত্ব থাকবে; তবে আলোচনা ও ধীরে ধীরে সমাধানের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপদ ও স্বস্তির সঙ্গে দেশ গঠনে কাজ করার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের চিত্র ইতিবাচক ছিল। এতে প্রমাণিত হয়েছে রাজস্ব কর্মকর্তারা সক্ষম। দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সম্মেলনের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে রাজস্ব আদায় নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

বক্তব্য শেষে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন স্টলে গিয়ে ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত উপস্থাপনাগুলো ঘুরে দেখেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে এ রাজস্ব সম্মেলনের আয়োজন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *