প্রবাসীদের টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, এরপর স্বজন পরিচয়ে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে নাটোরের লালপুরে একটি প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, চক্রটির সদস্যরা প্রথমে নারী কণ্ঠে প্রবাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। পরে কৌশলে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমোর মতো যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কখনও ভিসা বা আকামার মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলে, আবার কখনও বিদেশে বিপদের কথা জানিয়ে অর্থ দাবি করা হতো।
বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া (ভাঙাপাড়া) গ্রামে অভিযান চালিয়ে কাউসার আলী (২০), সোহাগ আলী (২৩) ও ইমন আলী (১৯)কে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে তাদের আদালতের মাধ্যমে নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তার কাউসার আলী মোহরকয়া ভাঙাপাড়া গ্রামের সাজদার প্রামাণিকের ছেলে। সোহাগ আলী একই গ্রামের মিজানুর রহমান বিশুর ছেলে এবং ইমন আলী টুটুল প্রামাণিকের ছেলে।
ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলে শুরু
পুলিশ ও প্রতারণার শিকার পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রটি প্রবাসীদের সঙ্গে নারী কণ্ঠে কথোপকথনের মাধ্যমে প্রথমে পরিচয় ও বন্ধুত্ব তৈরি করত। এরপর নানা কৌশলে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হতো।
অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের কাছে স্বজন পরিচয়ে যোগাযোগ করা হতো। আকামা বা ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে, এমন কথা বলে টাকা চাওয়া ছিল প্রতারণার অন্যতম কৌশল।
তবে সব সময় একই অজুহাত ব্যবহার করা হতো না। কখনও বলা হতো, বিদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কোনো প্রবাসী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আবার কখনও বিদেশি পুলিশ তাকে আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছে বলে পরিবারের কাছে খবর দেওয়া হতো। পরে চিকিৎসা কিংবা আইনি জটিলতা থেকে মুক্তির কথা বলে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হতো।
ব্যাংক রসিদ জালিয়াতির অভিযোগও
প্রতারণার শিকার কয়েকটি পরিবারের ভাষ্য, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেই থেমে থাকত না চক্রটি। টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের রসিদ জালিয়াতির মতো কৌশলও ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া নারী পরিচয়ে প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ এবং পরে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কায় অনেকে বিষয়টি প্রকাশ না করে দাবিকৃত অর্থ দিয়ে দিতেন বলে জানান তারা।
২০১৬ সাল থেকে বিস্তারের অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, ২০১৬ সাল থেকে ইমো হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ ধরনের প্রতারণা বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময়ে অনেক প্রবাসী ও তাদের পরিবার প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়লেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তাদের মতে, প্রবাসীরা দেশের বাইরে থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা পরিচিতজনের অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সহজেই পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস অর্জন করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
এদিকে লালপুরে এ ধরনের প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোও প্রতারণার এসব চক্র শনাক্ত ও নির্মূলে প্রশাসনের আরও জোরালো তৎপরতা দাবি করেছে।








