একবার পদ্মা কেড়ে নিয়েছিল পৈতৃক ভিটা। প্রায় তিন দশক পর সেই নদীই আবার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন করে গড়ে তোলা বসতির সামনে। এবার নিজের বাড়ির পাশাপাশি পুরো একটি জনপদ রক্ষায় নেমেছেন আমেরিকা প্রবাসী ইমরান মিয়া।
মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বানারী গ্রামের এই বাসিন্দা পদ্মার তীব্র ভাঙন ঠেকাতে নিজের সঞ্চয় থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে নদীর পাড়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করছেন। তার উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বালুর বস্তার এই অস্থায়ী প্রতিরোধ দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসবে না। তাদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মাণ করা না হলে বানারীসহ আশপাশের জনপদ রক্ষা করা কঠিন হবে।
যে চর একদিন আশ্রয় দিয়েছিল, আজ সেখানেই নদীর হানা
ইমরান মিয়ার পৈতৃক ভিটা ১৯৯০ সালে পদ্মার ভাঙনে নদীগর্ভে চলে যায়। পাঁচ বছর পর ওই এলাকাতেই আবার চর জেগে ওঠে। প্রায় ২০ বছর আগে সেই চরে নতুন করে বসতি স্থাপন করেন তিনি।
পরে সেখানে গড়ে তোলেন পার্কের আদলে একটি বাড়ি। দুই পাশে নদী, মাঝখানে তার স্বপ্নের সেই বাড়িতে ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পালন করতেন। জায়গাটি স্থানীয়দের জন্যও উন্মুক্ত ছিল। কোনো টিকিট ছাড়াই দূর-দূরান্তের মানুষ সেখানে ঘুরতে আসতেন। একসময় এটি পিকনিক স্পট হিসেবেও পরিচিতি পায়।
প্রতি বছর আমেরিকা থেকে স্ত্রীকে নিয়ে নিজের সেই বাড়িতে সময় কাটাতেন ইমরান। কিন্তু গত ১০ দিনের ভয়াবহ ভাঙনে বদলে গেছে পরিস্থিতি। নদী এখন বাড়ির একেবারে কাছে চলে এসেছে। এরই মধ্যে বাড়ির বেশ কিছু অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে।
‘বাড়ির গোড়ায় নদী’
নিজের উদ্যোগে ভাঙন ঠেকানোর কাজ শুরু করা ইমরান মিয়া বলেন, “আমাদের পৈতৃক ভিটাটি ৯০ সালে পদ্মায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর আবার চর জেগে ওঠে। চর ওঠার পরে দু-পাশেই পদ্মা নদী কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল। নদী পার হয়ে ২০০ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া দিয়ে বাড়িতে আসতাম। এখন বাড়ির গোড়ায় নদী।”
তিনি বলেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তবে তার মূল চিন্তা শুধু নিজের বাড়ি নিয়ে নয়।
ইমরানের ভাষায়, “এখানে ১০ হাজার পরিবার। তাদের বাঁচাতে হলে সরকারিভাবে স্থায়ী বাঁধ চাই।”
চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে নদীর পাড়
সরেজমিনে দেখা যায়, মিয়া বাড়ির একটি অংশ ইতোমধ্যে পদ্মার ভাঙনে হারিয়ে গেছে। নদীর তীরে শ্রমিকরা দিন-রাত বালুর বস্তা ফেলছেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় ভাঙন ঠেকানোর এই চেষ্টা চলছে।
বানারী গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় বলেন, গ্রামে কয়েকটি মসজিদ, গুচ্ছগ্রাম ও স্কুল রয়েছে। একসময় পদ্মা নদী ছিল অনেক দূরে। কিন্তু ভাঙতে ভাঙতে নদী এখন বসতির কাছে চলে এসেছে।
তাজুল ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, কয়েক বছর আগেও নদী অনেক দূরে ছিল। ধীরে ধীরে ভাঙতে ভাঙতে এখন বাড়ির কাছে এসেছে। এরই মধ্যে অনেক জমি নদীতে চলে গেছে। চলতি বর্ষার শুরু থেকেই ভাঙন তীব্র হয়েছে। দ্রুত বালুর বস্তা না ফেলা হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তিনি।
ঝুঁকিতে স্কুল, মসজিদ ও গুচ্ছগ্রাম
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বানারী গ্রামে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুচ্ছগ্রাম ও একাধিক মসজিদ। আশপাশে রয়েছে বিধুয়াইল, নগর, জোয়ার এবং ফরিদপুরের জাজিরা ইউনিয়ন। টঙ্গীবাড়ী ও জাজিরা মিলিয়ে এ অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস।
এ কারণে স্থানীয়দের দাবি, শুধু অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মাণ করা না হলে যেকোনো সময় স্কুল, মসজিদ, গুচ্ছগ্রামসহ পুরো জনপদ নদীতে চলে যেতে পারে।
ইমরানের উদ্যোগে পাউবোর সহযোগিতা
ভাঙন ঠেকাতে ইমরান মিয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবোর মাঠ কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এখানে ভাঙন শুরু হয়েছে। এর আগেও বালুর বস্তা ফেলা হয়েছিল, কিন্তু নদীর স্রোতে সেগুলো সরে গেছে। বর্তমানে ইমরান মিয়া ব্যক্তি উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণ করছেন এবং পাউবোও পাশাপাশি কাজ করছে।
উজানের পানিতে বাড়ছে স্রোত
বানারীর পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের আরও কয়েকটি নদীতীরবর্তী এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সদর উপজেলার শিলই, রাকির কান্দিসহ পদ্মার তীরবর্তী এলাকায় স্রোত বেড়েছে। ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীতেও পানির পরিমাণ বাড়ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, জেলার নদীগুলোতে পানির স্তর বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। সরেজমিনে টঙ্গীবাড়ী ও সদর উপজেলার পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় নদীতে তীব্র স্রোত দেখা গেছে। এতে ছোট নৌযান চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত দুই দিনে স্রোতের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
স্থানীয় ট্রলারচালক শহিদুল বলেন, কয়েক দিন ধরে নদীতে স্রোত অনেক বেশি। পানি বাড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, উজান থেকে পদ্মা দিয়ে পানি নামার কারণে নদীতে স্রোতের তীব্রতা বেড়েছে। এ কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। জনবল কম থাকলেও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং ভাঙনরোধে কাজ অব্যাহত রয়েছে।
নিজের হারানো ভিটায় আবার ঘর গড়েছিলেন ইমরান মিয়া। এবার সেই ঘরটিই যখন নদীর মুখে, তখন নিজের অর্থ ব্যয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তিনি। তবে তার এই ব্যক্তিগত উদ্যোগের সঙ্গে সরকারি স্থায়ী ব্যবস্থা যুক্ত না হলে বানারীর হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, এমনটাই আশঙ্কা স্থানীয়দের।








