পাঁচ বছর পর প্রিয়জনদের কাছে ফিরবেন, পরিবারের সঙ্গে কাটাবেন আনন্দের সময় সেই স্বপ্ন নিয়েই দিন গুনছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী পুলক নাথ (২৫)। আগামী শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। দেশে ফেরার মাত্র কয়েক দিন আগে আবুধাবির মোছাফফা শহরে মিশরীয় এক রুমমেটের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, মাত্র ২০ দিরহামকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্বজনরা। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন পুলক। তার ছোট ভাইও প্রতিবন্ধী। পরিবারের আশা-ভরসার জায়গা ছিলেন এই তরুণ। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং হত্যার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছে পরিবার।
শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে আবুধাবির মোছাফফা শহরে নিজের কর্মস্থলে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন নিহতের মা রানী বালা দেবী।
নিহত পুলক নাথ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার জিরি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিবেকানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা। তিনি মধুসূদন নাথের ছেলে।
২০ দিরহাম না দেওয়ায় ছুরিকাঘাতের অভিযোগ
পরিবারের দাবি, পুলকের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন মিশরীয় এক ব্যক্তি। ঘটনার দিন ওই রুমমেট তার কাছে ২০ দিরহাম চান। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলকের বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
২ নভেম্বর পটিয়ার জিরি ইউনিয়নে পুলকদের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার মা রানী বালা দেবীর সঙ্গে। ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
রানী বালা দেবী জানান, ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর রাঙ্গুনিয়ায় বসবাসরত পরিবারের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তারা পুলকের মৃত্যুর খবর পান। এরপর থেকেই পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন পুলক। ছোট ছেলে প্রতিবন্ধী হওয়ায় বড় ছেলেই সংসারের সব দায়িত্ব সামলাতেন। এখন পরিবারের ভরণপোষণ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
ছেলের হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে সরকারের কাছে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করারও আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন প্রতিবন্ধী ছোট ভাই
পুলকের ছোট ভাই অলক নাথ জানান, তার ভাইয়ের কাছে মিশরীয় এক রুমমেট ২০ দিরহাম চেয়েছিলেন। সেই টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করেই বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে পুলকের মৃত্যু হয়।
অলকের কাছে বড় ভাই শুধু পরিবারের উপার্জনকারী ছিলেন না, ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। সেই মানুষটিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা পুরো পরিবার।
পুলকের বোন চুমকি দেবী জানান, পাঁচ বছর পর আগামী শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভাইয়ের দেশে ফেরার কথা ছিল। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। কিন্তু তার আগেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে, তা কখনো কল্পনাও করেননি।
তিনি বলেন, ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায় ছিল পুরো পরিবার। এখন সেই অপেক্ষা পরিণত হয়েছে মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতিতে। ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ভাইয়ের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
বিচার ও মরদেহ ফেরাতে সরকারের সহযোগিতা চান স্বজনরা
পুলকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারাও সেখানে জড়ো হন। তারাও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানান। একই সঙ্গে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, দূতাবাসের মাধ্যমে নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা সম্ভব। এ ছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তা করা হবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, নিহত ব্যক্তি বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত শ্রমিক হলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করতে পারবেন। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
বাবাকে হারানোর পর যে ছেলে পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তার আকস্মিক মৃত্যুতে এখন অনিশ্চয়তার মুখে পুরো পরিবার। পাঁচ বছর পর বাড়ি ফেরার যে আনন্দঘন মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনরা, সেখানে এখন শুধুই শোক আর প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা।








