জীবিকার তাগিদে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর ইসমাইল হোসেন (৭০)। কিন্তু একসময় হঠাৎ করেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রথমে বন্ধ হয়ে যায় ফোন, এরপর পরিচিত নম্বরেও আর সাড়া মেলেনি। কর্মস্থল কিংবা সম্ভাব্য আবাসস্থলে খোঁজ নিয়েও পাওয়া যায়নি কোনো সন্ধান। দিন গড়িয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। এভাবে কেটে গেছে ২২টি বছর। দীর্ঘ সময়েও জানা যায়নি তিনি বেঁচে আছেন, নাকি না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। একপর্যায়ে স্বজনদের মনে প্রিয় মানুষটির বেঁচে থাকা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
বাবার এমন আকস্মিক অন্তর্ধানের ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি প্রবাসকথার সঙ্গে কথা বলেছেন ইসমাইল হোসেনের ছোট ছেলে ইমরান হোসেন। তিনিও বর্তমানে প্রবাসে থাকেন। বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে বড় ছেলে ইকবাল হোসেনের কাঁধে। একসময় পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় তিনিও পাড়ি জমান দক্ষিণ আফ্রিকায়।
ইমরান জানান, ১৯৮৯ সালে জীবিকার সন্ধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে যান তার বাবা। পেশায় তিনি ছিলেন গাড়িচালক। থাকতেন শারজাহ স্টেডিয়ামের পাশের এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে তিনি ‘আব্দুল্লাহ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তবে ২০০৪ সালের পর থেকে হঠাৎ করেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই কার্যত নিখোঁজ তিনি।
আক্ষেপের সঙ্গে ইমরান বলেন, সে সময় যোগাযোগব্যবস্থা এখনকার মতো উন্নত না হলেও বাবার সন্ধান পেতে পরিবারের পক্ষ থেকে নানা চেষ্টা করা হয়েছিল। পরিচিতজনদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা, কোনো কিছুতেই মেলেনি তার অবস্থান। দীর্ঘ ২২ বছর পার হলেও পরিবারের কেউ জানতে পারেননি, বাবা জীবিত আছেন কি না।
ইমরানের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন তারা। কিন্তু সেখান থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা কিংবা বাবার সন্ধানসংক্রান্ত কোনো কার্যকর তথ্য পাননি। ফলে বছরের পর বছর ধরে অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার মধ্যেই দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
তথ্য বলছে, প্রবাসে কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হওয়ার এই সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির ইসমাইল হোসেন ছাড়াও আছেন, নাম না জানা অনেক প্রবাসী। যারা এখনও ফেরেননি নিজেদের আপন ঠিকানায়। অনেক সন্তান, অনেক আত্মীয়-স্বজন জানেনও না তাদের প্রিয় মানুষটি কোথায় আছেন আর কেমন আছেন।
যদিও বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার সুনির্দিষ্ট ও হালনাগাদ মোট সংখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বছরে কতজন বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে নিখোঁজ হচ্ছেন, তাদের মধ্যে কতজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে কিংবা কতজনের সন্ধান মিলছে না, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক চিত্র পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ঘটনা এবং সরকারি সেবা-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, বিদেশে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পেতে পরিবারকে দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে হয়।
২৭ বছর পর ফিরলেন আমির, শেষ হলো পরিবারের অপেক্ষা
বিদেশে নিখোঁজ বাংলাদেশির সন্ধান পাওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা শরীয়তপুরের আমির হোসেন তালুকদারের। জীবিকার সন্ধানে ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়ায় যান তিনি। সেখানে রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। প্রথম তিন বছর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং দেশে টাকাও পাঠাতেন। কিন্তু এরপর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবার দীর্ঘদিন তার কোনো খোঁজ পায়নি। সময়ের সঙ্গে স্বজনদের মধ্যে তার মৃত্যুর আশঙ্কাও তৈরি হয়।
অবশেষে ২৭ বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে তার সন্ধান পাওয়া যায়। কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী তাকে একটি জঙ্গলের ভেতরে ছোট টিনের ঘরে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরে তারা তাকে উদ্ধার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির সহযোগিতায় এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ট্রাভেল পাসের ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর ২২ এপ্রিল রাতে দেশে ফেরেন আমির। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বিবেচনায় চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানায় সংস্থাটি। ঘটনাটি প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
রাশিয়ায় কাজের সন্ধানে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ
বিদেশে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের অন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়ায় বেসামরিক চাকরির আশ্বাসে গিয়ে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
এপির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান ও অন্যান্য বেসামরিক পেশায় চাকরির আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো এবং ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ করেছেন দেশে ফিরে আসা কয়েকজন বাংলাদেশি।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির অনুসন্ধানে এমন অন্তত ১০ বাংলাদেশি পুরুষের তথ্য পাওয়া যায়, যাদের পরিবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিল না। তাদের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে যুক্ত করার অভিযোগও উঠে আসে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থা কিংবা মৃত্যুর বিষয়টি আলাদাভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, বিদেশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণ নয়, মানবপাচার, প্রতারণামূলক নিয়োগ এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিও থাকতে পারে।
নিখোঁজদের সন্ধানে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা কী?
বিদেশে নিখোঁজ বাংলাদেশি নাগরিকদের খুঁজে পেতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক সেবা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নাগরিক সনদে এ সেবার জন্য আলাদা প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সদস্য বা অভিভাবককে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) বরাবর লিখিত আবেদন করতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার জন্য কনস্যুলার ভবনের ৩০২ নম্বর কক্ষ নির্ধারিত রয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা।
আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হিসেবে দিতে হবে,
১. নিখোঁজ ব্যক্তির পাসপোর্ট অথবা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
২. বিদেশে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের দেওয়া চাকরির চুক্তিপত্র বা ইকামার কপি, যদি থাকে।
৩. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা পাসপোর্টের কপি।
৪. আবেদনকারীর পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর।
৫. নিখোঁজ ব্যক্তির সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল নম্বর এবং ফেসবুক আইডিসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য।
মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সনদ অনুযায়ী, এ সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয় এবং আবেদন পাওয়ার পর এক কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাসে চিঠি পাঠানোর কথা রয়েছে। তবে এটি নিখোঁজ ব্যক্তিকে এক কর্মদিবসে খুঁজে পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে অনুসন্ধানের অনুরোধ পাঠানোর প্রশাসনিক সময়সীমা।
পরিবারের জন্য সবচেয়ে জরুরি তথ্য কী?
বিদেশে থাকা কোনো বাংলাদেশির সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ না হলে পরিবারের সদস্যদের উচিত অনুমানের ভিত্তিতে তার মৃত্যুর খবর প্রচার না করে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির পাসপোর্ট নম্বর, ভিসা, কর্মস্থলের নাম-ঠিকানা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য, সর্বশেষ যোগাযোগের সময় ও অবস্থান এবং পরিচিত ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও কল্যাণ অনুবিভাগে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো প্রয়োজন। পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছেও নিখোঁজের অভিযোগ করা যেতে পারে।
এ ছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২৪ ঘণ্টার প্রবাসী কল সেন্টারে যোগাযোগ করা যায়। দেশে থেকে টোল ফ্রি নম্বর ১৬১৩৫ এবং বিদেশ থেকে +৮৮০ ৯৬১০১০২০৩০ নম্বরে সহায়তা চাওয়া যায়।
বিদেশে কাজ করতে যাওয়া একজন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সংকট নয়; অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষা।
আমির হোসেনের মতো কেউ কেউ বহু বছর পর পরিবারের কাছে ফিরতে পারেন। আবার কারও সন্ধান পেতে পরিবারকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। তাই বিদেশে নিখোঁজ বাংলাদেশিদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, দূতাবাসগুলোর সমন্বিত অনুসন্ধান এবং পরিবারের কাছে নিয়মিত অগ্রগতি জানানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।








