সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

ভালো নেই চা বাগানের নারী শ্রমিকরা

‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র দেশ মৌলভীবাজার। সবুজ গালিচার মতো দৃষ্টিজুড়ে থাকা চা বাগানের যেমন সৌন্দর্য রয়েছে, তেমনি এর বিপরীতে রয়েছে নারী চা শ্রমিকদের ভালো না থাকার নানা চিত্র। তারা নানা দিক থেকেই ভালো নেই।

মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে কর্মরত আছেন প্রায় এক লাখ শ্রমিক। তাদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। কিন্তু দুটি পাতা আর একটি কুঁড়ি উঠে আসে যাদের হাত দিয়ে, সেই নারীরাই রয়ে গেছেন অধিকারবঞ্চিত। কর্মক্ষেত্রে নেই স্বাস্থ্যসুবিধা। নেই বিশ্রামাগার বা টয়লেটের ব্যবস্থা।

রোদ, বৃষ্টি, ঝড়েও প্রতিদিনই তাদের তুলতে হয় ২০ থেকে ২৫ কেজি চা-পাতা। এসব চা বাগান ও সংলগ্ন বস্তি এলাকায় বসবাসকারী নারী শ্রমিকদের জীবন কাটছে বঞ্চনা আর বৈষম্যের মধ্যে। অর্থসংকটে অনেকেই ঝুঁকছেন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। এর মধ্যে বাগানে কাজ পাচ্ছেন না, এমন নারী শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি।
এ অবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও তা এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি।

ভাড়াউড়া চা বাগানের নারী শ্রমিক সীতা হাজরা জানান, চা বাগানের নারীদের কাছ থেকে সস্তায় শ্রম পাওয়া যায়। বাগানে সারাদিন পরিশ্রম করে মজুরি ১৭০ টাকা, আর শহরে কাজ করলে সর্বোচ্চ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়। অথচ পুরুষ শ্রমিকদের বেলায় এ মজুরি হয় ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত। চা বাগানের নারী শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের পাশাপাশি বিনোদন ও বিশ্রামের অধিকার থাকলেও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলার নারী শ্রমিকরা সে অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রায় ২শ বছর ধরে চা বাগানে বংশপরম্পরায় কাজ করছেন চা শ্রমিকরা। তাদের শ্রমে এ শিল্পের উন্নয়ন হলেও নারী শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না।

আলীনগর চা বাগানের মনি রিকিয়াশন বলেন, ঘুম থেকে উঠেই নাশতা সেরে কাজে বের হন এবং বাড়ি ফেরেন সন্ধ্যা নাগাদ। এরপর পরিবারের কাজে ব্যস্ত সময় কাটান। বাগানে যাদের কাজ নেই, তারা বিভিন্ন সাইটে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। কেউ কেউ আবার গাছ কাটাসহ অন্যের বাড়িতেও কাজ করেন। এভাবেই কাটে তাদের দিন।

ফুলছড়া চা বাগানের নারী চা শ্রমিক বাসন্তী হাজরা আক্ষেপ করে বলেন, বৃষ্টির দিনে ঝড়ে ঘরের চালা উড়ে গেলে মালিকের অনুমতি ছাড়া তা মেরামত করা যায় না। আমাদের সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। গর্ভবতী মায়েরা চিকিৎসার অভাবে এবং অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত অবস্থায় সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। আমাদের কুঁড়েঘরটিই গর্ভবতী মায়েদের সন্তান প্রসবের স্থান।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি ও নারী নেত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, চা বাগানে মায়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যের অবস্থা খুবই নাজুক। পাহাড়-জঙ্গলে কাজ করা এই মায়েরা প্রয়োজনীয় খাবার পান না। এখানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমও কম। বেশি সন্তান নেওয়ার কারণে তাদের শরীর ভেঙে পড়ে। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়। তখন বাধ্য হয়ে তাদের পরিবারকে গরু বিক্রি করতে হয়, নয়তো এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক এনজিও নারীকর্মী বলেন, অনেক চা বাগানে বাল্যবিয়ে বাড়ছে। অনেক চা শ্রমিক পরিবারের দুই থেকে তিনটি মেয়ে থাকে। মেয়ে বড় হলে বাসায় রেখে কাজে যেতে নিরাপত্তার অভাব থাকে। এজন্য মেয়েদের বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কম বয়সে বিয়ের কারণে সন্তান জন্ম দিচ্ছে তারা। আর্থিক সংকটে ঠিকমতো খাবার না পাওয়ায় অপুষ্টিতে ভুগছে মায়েরা।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) নিপেন পাল বলেন, চা শিল্পে শ্রমজীবী নারীদের একটি বড় অংশ বেকার। তাদের মধ্যে তরুনী ও মধ্যবয়সী নারীও রয়েছেন। জীবিকার তাগিদে চা শিল্পের বাইরে নির্মাণকাজ, মাটি কাটা, মাথায় টুকরি নিয়ে ইট, বালু ও পাথর বহনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা ও চা-শ্রমিক নেতা রাম ভজন কৈরী জানান, চা বাগানের শ্রমিকরা কঠিন পরিশ্রম করলেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। চা শ্রমিকরা ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে বাস করছেন। দেশ স্বাধীন হয়েছে, তবে চা শ্রমিকরা আজও তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। মজুরি বোর্ড চা বাগানের শ্রমিকদের প্রতি অবিচার করছে। নারী শ্রমিকরা কর্মস্থলে উপযুক্ত পরিবেশ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। চা শ্রমিকের জীবনটাও যেন ছেঁটে দেওয়া চা গাছের মতোই, লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের কুঁড়েঘরে বন্দি। প্রাচীন ভূমিদাসের মতোই চা বাগানের সঙ্গে বাঁধা তাদের নিয়তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *