গাজামুখী মানবিক সহায়তাবাহী ফ্লোটিলার কর্মীদের সঙ্গে বাস্ক পুলিশের আচরণকে কেন্দ্র করে স্পেনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইসরাইলি আটক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসা কর্মীদের ঘিরে শনিবার বিলবাও বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের প্রতিবাদে রোববার শহরজুড়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় দুই হাজার মানুষ অংশ নেয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় শনিবার, যখন ইসরাইল থেকে ফেরত আসা ছয়জন ফ্লোটিলা কর্মী বিলবাও বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত এক কর্মীর আত্মীয় তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে জোর করে আটকে দেন। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত জনতার ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভিই প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, পুলিশ লাঠিচার্জ করছে এবং কয়েকজনকে মাটিতে ফেলে আটক রাখছে। ঘটনাস্থলে থাকা মানুষজন তখন পুলিশের বিরুদ্ধে চিৎকার ও প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এর আগে কিছু কর্মী অন্য যাত্রীদের বের হওয়ার পথ আটকে দিলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে বলে জানা যায়।
বাস্ক আঞ্চলিক পুলিশ বাহিনী এরত্সাইন্তজা জানিয়েছে, এ ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অবাধ্যতা, গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দু’জন তুরস্ক হয়ে সদ্য ফিরে আসা ফ্লোটিলা কর্মী ছিলেন বলে স্প্যানিশ গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। এক বিবৃতিতে এরত্সাইন্তজার অভ্যন্তরীণ বিভাগ বলেছে, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ম ও প্রটোকল অনুযায়ী ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
রোববার বিলবাওয়ে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা বাস্ক পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং স্থানীয় সরকারের বিরুদ্ধে ‘জায়নবাদকে সহযোগিতা’ করার অভিযোগ তোলেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড।
এদিকে ফ্লোটিলা আয়োজকরা দাবি করেছেন, ইসরাইলি হেফাজতে থাকা অবস্থায় কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। শুক্রবার তারা অভিযোগ করেন, অনেক কর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে এবং অন্তত ১৫ জন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের অভিযোগের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া ৪৪ জন ছিলেন স্প্যানিশ নাগরিক। তাদের একটি অংশ শনিবার বার্সেলোনা বিমানবন্দরে ফিরে আসেন। সেখানে সমর্থকরা তাদের স্বাগত জানান। উপস্থিতদের মধ্যে স্পেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী আর্নেস্ত উর্তাসুনও ছিলেন।
অন্যদিকে, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিওতে তাকে আটক ফ্লোটিলা কর্মীদের নিয়ে উপহাস করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে স্পেনসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্রানচেসকা আলবানিজ বিলবাও বিমানবন্দরের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। সংস্থাটি বলেছে, প্রকাশিত ভিডিওতে এমন কোনো পরিস্থিতি দেখা যায়নি যা পুলিশের বলপ্রয়োগকে যৌক্তিক করে। বিশেষ করে মাটিতে পড়ে থাকা ব্যক্তিদের ওপর বারবার লাঠি ব্যবহারকে তারা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে।
ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে স্পেনে অবস্থিত ইসরাইল দূতাবাসও স্প্যানিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া ব্রিটিশ ও আইরিশ কর্মীরাও শনিবার নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। তুরস্ক হয়ে ডাবলিন বিমানবন্দরে পৌঁছানো আইরিশ কর্মীদের মধ্যে ছিলেন মার্গারেট কনলি, যিনি আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনলির বোন। তিনি জানান, তাদের কন্টেইনারের মতো সংকীর্ণ জায়গায় আটকে রাখা হয়েছিল এবং সেখানে অনেকেই হাইপোথারমিয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিলেন।
ডাবলিন বিমানবন্দরে ফিলিস্তিনের পতাকা ও ‘কেফায়া’ স্কার্ফ পরা সমর্থকেরা কর্মীদের স্বাগত জানান। ফিরে আসা কর্মীরা অভিযোগ করেন, আটক অবস্থায় তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
ফ্লোটিলার সদস্য টম ডেসি বলেন, তাদের আলাদা দলে ভাগ করে রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তী কয়েক দিন ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়গুলোর একটি।
অন্যদিকে, ব্রিটেনভিত্তিক সাতজন কর্মী লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরে পৌঁছালে দেখা যায়, তাদের অনেকেই তখনও ইসরাইলি কারাগারের পোশাক পরে আছেন। তারা অভিযোগ করেন, ফ্লোটিলা আটক করার সময় ইসরাইলি বাহিনী রাবার বুলেট ব্যবহার করেছিল।
ওয়েলসের ৬২ বছর বয়সী কর্মী হানা শ্যাফার বলেন, তার সেলে থাকা এক নারীর পায়ে রাবার বুলেটের আঘাতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল।








