যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র অর্থনৈতিক চাপ এবং জ্বালানি সংকটে কিউবার জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। দেশটির পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। গত শনিবার সেন্ট্রাল কিউবার মোরন শহরে বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির একটি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে। ক্রমবর্ধমান খাদ্য ও বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে, যা দ্বীপরাষ্ট্রটিকে এক মানবিক জরুরি অবস্থার দোরগোড়ায় নিয়ে গেছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে কিউবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
কিউবার এই বর্তমান পরিস্থিতির মূলে রয়েছে জ্বালানি সংকট। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করা হলে কিউবার তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত শুক্রবার কিউবান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ ক্যানেল জানান, তিন মাস ধরে দেশটিতে কোনো তেলের চালান আসেনি। এর ওপর গত ২৯ জানুয়ারি ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কিউবার জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির পথ কার্যত রুদ্ধ করে দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার পর এবার তার লক্ষ্য কিউবা। গত ৭ মার্চ ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে লাতিন আমেরিকান নেতাদের এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘কিউবা তালিকার শেষে রয়েছে। আমরা ভেনেজুয়েলায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন অর্জন করছি, আমরা কিউবাতেও সেই মহান পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছি, যা শিগগির আসতে চলেছে।’
এই গভীর সংকটের মাঝেই কিউবার রাজনীতিতে নতুন এক মুখ সামনে এসেছে। তিনি হলেন সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গিলারমো রদ্রিগেজ কাস্ত্রো, যিনি ‘রাউলিতো’ নামে পরিচিত। ৪১ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ ক্যানেলের সঙ্গে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সরকার পরিবর্তনের হুমকির মুখে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে, তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন। রুবিও কিউবার সংকট প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘কিউবাকে পরিবর্তিত হতে হবে। পরিবর্তন দরকার। সব একসঙ্গে করতে হবে না। এক দিনেই করতে হবে না। এখানে সবাই পরিণত ও বাস্তববাদী। তাদের বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে। যদি তারা এমন সংস্কার আনে, যা কিউবার মানুষের জন্য অর্থনৈতিক এবং পরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই তা দেখতে চাইবে।’
বর্তমানে কিউবার পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশজুড়ে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট বাড়ছে এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ করে শিক্ষার্থীরা অবস্থান ধর্মঘট পালন করছে। পর্যটন খাত ধসে পড়েছে এবং হাসপাতালেও চিকিৎসাসেবা সীমিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক দিয়ানা কোরেয়ার মতে, রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর প্রকাশ্যে উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাউল কাস্ত্রো এখনো প্রভাবশালী এবং তিনি হয়তো প্রজন্মের ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতার পথ খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই এখন বলছেন, এটি আসলে প্রজন্মগত ক্ষমতা হস্তান্তর, হয়তো আড়ালে, কিন্তু কার্যকর নিয়ন্ত্রণে। কাস্ত্রোকে আলোচনায় আনা মানে অন্তত বাইরে থেকে এমন বার্তা দেওয়া যে আলোচনা গুরুতর, কারণ এই ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন।’








