মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জনশক্তি রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ায় বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজতে তৎপর হয়েছে সরকার। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজার যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখনই নতুন সংকট হিসেবে সামনে আসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। এর আগে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় বিদেশগামী শ্রমিকদের ভোগান্তি বাড়ে। এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই শঙ্কাকে আরও গভীর করছে।
তবে অনিশ্চয়তার মধ্যেও থেমে নেই বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ এখনও বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় অপেক্ষা করছেন। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, দালালচক্রের কারণে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেও বিদেশ যেতে পারছেন না। তারা সরকারের কাছে স্বচ্ছ ও নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সরকারি তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানিয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশে গেছেন ৯ লাখ ৬৬ হাজার শ্রমিক। পরের অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ২৬ হাজারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশে যান ১১ লাখ ৮১ হাজার কর্মী। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ১৫ হাজারে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বিদেশে গেছেন ৮ লাখ ১৬ হাজার কর্মী, যাদের বড় অংশ নির্মাণশ্রমিক। সৌদি আরব এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার।
সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কাতার চার ধরনের পেশায় বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও আলোচনা চালানো হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, সরকার শুধু প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভর থাকতে চায় না। কোন কোন খাতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কর্মী চায়, তা চিহ্নিত করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প বাজার তৈরি এবং দক্ষ কর্মী রপ্তানি বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়। দক্ষতা বাড়াতে না পারলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও যুব প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ এখনও সেই অনুযায়ী জনবল তৈরি করতে পারেনি। ফলে দেশের শ্রমবাজার এখনও মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়াকেন্দ্রিক। দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্স আয় আরও বাড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই শ্রমবাজারের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন বাজার খোঁজা এবং দক্ষ কর্মী তৈরির উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।








