রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

সবশেষ

সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা আর নয়, ক্যাম্পাস থেকেই তৈরি হবে উদ্যোক্তা: প্রধানমন্ত্রী

প্রচলিত সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক শিক্ষার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিক্ষাজীবন শেষ করে শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশ নয়, বরং ক্যাম্পাস থেকেই তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

রোববার (৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে ‘দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো ব্যবহারিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও বাস্তবভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘সিড ফান্ডিং’ এবং ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণাগুলো বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তরুণরা নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল যোগাযোগ ও আর্থিক জ্ঞান এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের অপরিহার্য দক্ষতা। পাশাপাশি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো প্রযুক্তি, থ্রিডি প্রিন্টিং ও ফাইভ-জি প্রযুক্তির মতো উদীয়মান খাতেও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হবে।

উচ্চশিক্ষাকে শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ জোরদার এবং ইন্টার্নশিপ বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বৃহৎ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। দুই হাজারের বেশি কলেজ এবং ৪০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ সময় তিনি অতীতের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন একটি জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতানির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সামনে নৈতিকতা, সততা ও নেতৃত্বের উদাহরণ স্থাপন করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশ সচেতনতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হতে হবে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি অন্তত একটি অতিরিক্ত ভাষা আয়ত্ত করতে পারলে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে বলেও তিনি মত দেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং শিল্পখাতের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *