সিন্ধু পানিচুক্তি (আইডব্লিউটি) ঘিরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পাকিস্তান সরকার এবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী দেশটির প্রাপ্য পানির প্রবাহে বাধা দেওয়ার যে কোনো প্রচেষ্টার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুসাদিক মালিক এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, সিন্ধু পানিচুক্তির আওতায় পাকিস্তানের প্রাপ্য পানির ওপর কেউ হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে ‘তার হাত কেটে ফেলা হবে’। তার এই বক্তব্যের পর দুই দেশের মধ্যে পানি ইস্যুতে চলমান উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এনডিটিভির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই হামলায় ২৫ জন পর্যটক ও একজন স্থানীয় বাসিন্দা নিহত হন।
সংবাদ সম্মেলনে মুসাদিক মালিক অভিযোগ করেন, ভারত পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান কখনোই তার প্রাপ্য পানির অংশ থেকে বঞ্চিত হতে দেবে না।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে এনডিটিভি জানায়, মুসাদিক মালিক বলেন, প্রতিবেশী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী পানির উৎস নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন এবং দাবি করেছেন, পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর জীবিকা নির্বাহ করেন। এমন পরিস্থিতিতে পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হলে তা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, প্রায় অর্ধেক কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির প্রায় ২৫ শতাংশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মুসাদিক মালিকের ভাষ্য, পাকিস্তান আগেও সতর্ক করেছে, দেশটির ন্যায্য পানির অংশ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে তার কঠোর পরিণতি হবে। তিনি বলেন, নিজেদের অধিকার রক্ষায় পাকিস্তান প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। এটি নতুন কোনো অবস্থান নয়; বরং আগেও একই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিশ্বের বহু স্থানে আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকলেও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে উজানের দেশগুলো ভাটির দিকে পানিপ্রবাহ অব্যাহত রাখে। সেখানে সিন্ধু নদব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি বৈধ চুক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও পানি আটকে দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তবে এনডিটিভি জানায়, পাকিস্তানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মুসাদিক মালিকের বক্তব্য প্রকাশিত হলেও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়লেও, সংবাদমাধ্যমটি স্বাধীনভাবে এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
একই সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, সিন্ধু পানিচুক্তি এখনও আইনগতভাবে কার্যকর এবং এটি কোনো পক্ষ একতরফাভাবে স্থগিত, বাতিল বা সংশোধন করতে পারে না। তার ভাষ্য, চুক্তি অনুযায়ী সিন্ধু নদব্যবস্থার পানির ওপর পাকিস্তানের জনগণের বৈধ অধিকার রয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেও পাকিস্তানের অবস্থান সমর্থন পেয়েছে। কারণ এই চুক্তি একতরফাভাবে প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
আতাউল্লাহ তারার বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধিকবার বলেছেন, দেশের জন্য পানি শুধু একটি সম্পদ নয়, এটি পাকিস্তানের ‘লাইফলাইন’ এবং একই সঙ্গে ‘রেডলাইন’।
এদিকে, এনডিটিভি স্মরণ করিয়ে দেয়, কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের কেন্দ্রীয় পানিসম্পদমন্ত্রী সি আর পাটিল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সিন্ধু নদব্যবস্থায় ভারতের জন্য নির্ধারিত পানির পুরো অংশ ব্যবহার করা হবে এবং ভারতের প্রাপ্য এক ফোঁটা পানিও পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানিচুক্তির আওতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদী এবং এর উপনদীগুলোর পানিবণ্টন ও ব্যবহারের নীতিমালা নির্ধারিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তিই নদীর পানিব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে কার্যকর রয়েছে।








