সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

সবশেষ

স্থায়ী মর্যাদা নিন, না হয় দেশে ফিরুন—মার্কিন বার্তায় টিপিএসধারী অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ কি অনিশ্চিত?

যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা (টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস) নিয়ে বসবাসরত হাজারো অভিবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এই মর্যাদাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার সুযোগ নেই। ফলে যারা টিপিএসের আওতায় রয়েছেন, তাদের হয় বৈধ স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (গ্রিন কার্ড) পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে, না হলে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটিবিষয়ক মন্ত্রী মার্কওয়েন মোলেন রোববার সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বলেন, টিপিএস কখনোই স্থায়ী অভিবাসন সুবিধা হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তার ভাষায়, যারা যোগ্য, তারা স্থায়ী মর্যাদার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন। অন্যথায় সরকার তাদের নিজ দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।

মন্ত্রী জানান, দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য বিমান ভাড়ার পাশাপাশি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে প্রায় ২ হাজার ১০০ ডলার আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিভক্ত রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে হাইতি ও সিরিয়ার শত শত অভিবাসীর টিপিএস বাতিলের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এতদিন এই মর্যাদা তাদের যুদ্ধ, সহিংসতা ও চরম সংকটে থাকা নিজ দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছিল। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে অভিবাসন নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একই দিনে আশ্রয়প্রার্থীদের নীতিসংক্রান্ত আরেকটি মামলাতেও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য বড় ধরনের সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজের সুযোগ দিতে টিপিএস চালু করা হয়। অতীতে এই মর্যাদার মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হলেও বর্তমান প্রশাসন ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের জন্য এই সুবিধা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তবে পরিস্থিতির একটি বড় বৈপরীত্যও সামনে এসেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এখনও হাইতি ও সিরিয়ায় ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতা বহাল রেখেছে। তাদের মতে, দেশ দুটিতে ব্যাপক সহিংসতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও অপহরণের ঝুঁকি রয়েছে।

২০১০ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর প্রথম হাইতির নাগরিকদের জন্য টিপিএস চালু করা হয়। অন্যদিকে, ২০১২ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে দেশটির নাগরিকদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা হয়।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান রিপাবলিকান দলের ভেতরেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। ওহাইওর গভর্নর মাইক ডিওয়াইন সিএনএনকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাইতিয়ানদের দেশে ফেরত পাঠানো নিরাপদ নয়। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক কর্মীকে সরিয়ে দিলে অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ওহাইওতে বহু হাইতিয়ান স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আলঝেইমারে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা নার্সিং হোমে থাকা মানুষের দেখাশোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাদের অনেকেই পালন করছেন। তাই তাদের সরিয়ে দিলে সাধারণ মানুষই ভোগান্তিতে পড়বেন।

এর আগে, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওহাইওতে বসবাসরত হাইতিয়ান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, তারা অন্যদের গৃহপালিত প্রাণী খেয়ে ফেলেন। যদিও অভিযোগটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পখাতের পতনের পর ওহাইওর কয়েকটি অঞ্চলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে হাইতিয়ান অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের অংশগ্রহণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় শ্রমবাজারে মজুরিও বেড়েছে।

সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অবস্থান টিপিএসধারী অভিবাসীদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে যেসব দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *