যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন এক পরীক্ষার মুখে পড়েছে। এমন আলোচনা এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে সাম্প্রতিক মতবিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনা বাড়লেও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলে অনেকের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রই দেশটির সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে পাশে রয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ দেশেও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে তার পরাজয়ের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ওয়াশিংটনের আগ্রহ, অন্যদিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ চাপে দুইয়ের মধ্যে পড়ে নেতানিয়াহু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন সময় পার করছেন।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের পর তেহরানকে ঘিরে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় তেহরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার শর্ত দেওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের অবস্থানের ব্যবধান আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপ, যার সত্যতা হোয়াইট হাউস অস্বীকার করেনি, সেই উত্তেজনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। ওই কথোপকথনে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ইতি টানতে আগ্রহী অবস্থান থেকে লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখার প্রশ্নে নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন বলে জানা যায়।
খবরে বলা হয়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন, তার হস্তক্ষেপ না থাকলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অনেক আগেই কারাগারে যেতেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ‘জানেন আসল বস কে’। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মন্তব্য দুই নেতার সম্পর্কের বর্তমান অবস্থারই প্রতিফলন।
এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সম্প্রতি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র নেতা, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল। একই সঙ্গে তিনি সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান চুক্তির সমালোচনা করা ইসরায়েলি মন্ত্রীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশটির প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত অস্ত্রের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে সংগ্রহ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইসরায়েল ইস্যুতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, শুধু সাধারণ মার্কিন নাগরিক নয়, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) আন্দোলনের একটি অংশও ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
মার্জোরি টেইলর গ্রিনের মতো প্রভাবশালী ডানপন্থী ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন প্রকাশ্যে ইসরায়েলপন্থী নীতির সমালোচনা করেছেন। কার্লসনের অভিযোগ, ইসরায়েল ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানে হামলায় রাজি করিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান মনে করেন, রিপাবলিকান দলের ঐতিহ্যগত ইসরায়েলপন্থী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে। তার মতে, ট্রাম্প চাইলে রিপাবলিকানদের বড় অংশকে নিজের অবস্থানের পক্ষে আনতে পারবেন, এমনকি কিছু ডেমোক্র্যাটও তাকে সমর্থন করতে পারেন।
ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের গুরুত্বও অত্যন্ত গভীর। ২০১৬ সালের সমঝোতা স্মারকের আওতায় ১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পাচ্ছে ইসরায়েল, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা চুক্তি।
শুধু সামরিক নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সমর্থন ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পরও জাতিসংঘে ইসরায়েলবিরোধী একাধিক প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ছয়বার ভেটো দিয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতিকে নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করছেন বিরোধীরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সরকার পরিবর্তন না হলে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এবং সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী গাদি আইজেনকোটও নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ট্রাম্প ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোতে বাধ্য হয়েছেন।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিম্রোদ ফ্ল্যাশেনবার্গ বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং কূটনৈতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে মার্কিন লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ইসরায়েলের মতবিরোধ হয়েছে। তবে বর্তমান প্রশাসনের মতো এত প্রকাশ্য ও কঠোর ভাষায় সম্পর্কের টানাপোড়েন আগে খুব কমই দেখা গেছে। তার ভাষায়, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শিবিরের ভোটারদের মধ্যেই এখন ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমেছে।
তবে মিলার মনে করেন, এই উত্তেজনা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটছে, এমন কোনো বাস্তব ইঙ্গিত নেই। তার মতে, ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে হলে ট্রাম্পের এমন কোনো কূটনৈতিক সাফল্যের প্রয়োজন, যা তাকে রাজনৈতিকভাবে বড় অর্জন এনে দেবে। কিন্তু গাজা, লেবানন বা সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মতো কোনো ইস্যুতেই বর্তমানে সেই সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সম্ভাবনাও আপাতত সীমিত।








