ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চালু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে ১ হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা। এর মাধ্যমে যানবাহনের গতিসীমা লঙ্ঘন, অবৈধ পার্কিং, উল্টোপথে চলাচলসহ বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাট এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল মনিটরিং সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রযুক্তির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ফলে মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মহাসড়কে মালিকপক্ষ, শ্রমিক ফেডারেশন কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে যে ধরনের চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, সেসব কর্মকাণ্ডও এআই ক্যামেরার নজরদারিতে আসবে। ক্যামেরায় এসব ঘটনা রেকর্ড থাকায় চাঁদাবাজির প্রবণতা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো যানবাহন নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে, অবৈধভাবে পার্কিং করলে, থ্রি-হুইলার নিয়ে মহাসড়কে চলাচল করলে কিংবা উল্টোপথে গেলে তা ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য পাঠানো হবে।
জরিমানার অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও থাকছে ডিজিটাল ব্যবস্থা। মামলা সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মালিক বিকাশ, নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে একাধিকবার আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে গাড়ির নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি বিআরটিএর বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি এ ব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেন।
২৫০ কিলোমিটারে ১,৪২৭ ক্যামেরা
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেইট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে এসব এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন প্রয়োগের ফলে চালক ও পুলিশের সরাসরি যোগাযোগ কমবে। এতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ার পাশাপাশি অনিয়ম ও হয়রানির সুযোগও কমতে পারে।
থ্রি-হুইলার নিয়ে কঠোর অবস্থান
মহাসড়কে থ্রি-হুইলার ও নন-মোটরাইজড যানবাহনের চলাচল বন্ধ রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, মহাসড়কে কোনো অবস্থাতেই নন-মোটরাইজড যানবাহন বা থ্রি-হুইলার চলাচল করা উচিত নয়।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্যাস স্টেশন, বাজার এলাকা, নির্ধারিত স্ট্যান্ড ও ফিডার রোডে এসব যানবাহনের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনা করতে হাইওয়ে পুলিশের প্রধানকে অনুরোধ করেছেন তিনি।
পর্যায়ক্রমে সব মহাসড়কে চালুর পরিকল্পনা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালুর পর এআই অটো ফাইন সিস্টেমের কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করা হবে। ব্যবস্থাটিতে কোনো ভুল-ত্রুটি ধরা পড়লে তা সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও একই প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার মতে, ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি বাড়লে মহাসড়কের বিভিন্ন অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতাও বাড়বে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ালেই মহাসড়কের সব সমস্যা সমাধান হবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন হাট-বাজার, শিল্পকারখানা, বাসস্ট্যান্ড, ফিডার ও সংযোগ সড়ক এবং পর্যাপ্ত সার্ভিস লেনের ঘাটতির মতো বাস্তব সমস্যাগুলোও রয়েছে। তাই এআইভিত্তিক নজরদারির পাশাপাশি এসব অব্যবস্থাপনা দূর করার উদ্যোগও প্রয়োজন।
হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের আশা, নতুন এই ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন দ্রুত শনাক্ত ও জরিমানা আদায় করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতেও এটি ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি ফারুক আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, স্থানীয় সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।








