সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড, খবর পেল গণমাধ্যমে; পরিবারের পাশে নেই কেউ

পরিবারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে স্বচ্ছলতার মুখ দেখাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নজরুল ইসলাম। বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় কারাবন্দি হন তিনি। এরপর তিন বছর তিন মাস কেটে গেলেও ছেলের গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে পারেননি বলে দাবি পরিবারের। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও পরিবার প্রথম জানতে পারে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে। স্বজনদের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ডের আগে তাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি।

নজরুলের মৃত্যুর পর এখন একদিকে শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে দিশাহারা পরিবার। তাদের দাবি, কী অভিযোগে নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ায় কী ঘটেছে এবং তার মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, কোনো প্রশ্নেরই উত্তর তারা এখনো পাননি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে নজরুল। চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও তারা কিছু জানেন না।

গ্রেপ্তারের কারণ জানেন না বাবা-মা
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান নজরুল ইসলাম। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা। কিন্তু যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে এবং ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ।

নজরুলের গ্রেপ্তারের খবর পরিবার পেয়েছিল। কিন্তু ঠিক কী অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে, তা জানতে পারেনি বলে দাবি স্বজনদের। এরপর দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস তিনি কারাগারে ছিলেন।

নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকার সময়ও প্রতি রোববার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন ছেলে। সেই যোগাযোগের কারণে তারা তার খবর পেতেন। কিন্তু গত বুধবার হঠাৎ গণমাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেখে তারা জানতে পারেন, নজরুল আর বেঁচে নেই।

পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের কিছু জানানো হয়নি। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে কোনো তথ্যও তারা পাননি।

তবে নজরুলের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, সৌদি আদালতে কী বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে এবং তার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না, এসব বিষয়ে পরিবারের বক্তব্যের বাইরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে মারা গেলেন ফুফু
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছিরের কাছে ছেলের মৃত্যুর খবর এসেছে আকস্মিক আঘাত হয়ে। তার ভাষ্য, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন তিনি। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার আশায় সৌদি আরবে পাঠানো সেই ছেলের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা পেয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় কারাবন্দি হওয়ার পর আর্থিক প্রত্যাশা তো পূরণ হয়নি, উল্টো ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।

আব্দুল বাছির বলেন, এখনো তিনি জানেন না, কী কারণে তার ছেলেকে কারাগারে রাখা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর খবর দেখে বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।

ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর বুধবার রাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নজরুলের আপন ফুফু আবেদা বেগম। একসঙ্গে দুটি শোকের ধাক্কায় পরিবারটি আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

আব্দুল বাছিরের এখন প্রধান চাওয়া, ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য চান তিনি। তার বক্তব্য, অন্যায়ভাবে সাজা দেওয়া হয়ে থাকলে এর বিচার হওয়া উচিত।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ার অভিযোগ
নজরুলের মৃত্যুর পর বিরামপুর গ্রামের মানুষ তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন। স্বজনদের সমবেদনা জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে পরিবারের দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও সরকারি কোনো পক্ষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সিনিয়র সহসভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, নজরুল এমন কোনো অপরাধ করেছেন বলে তার মনে হয় না, যার জন্য তাকে এ ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বাংলাদেশ সরকারের উচিত সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সঠিক তথ্য উদঘাটন করা।

বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকে যোগাযোগ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তবে দূতাবাসের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা যাচাই করার মতো বিস্তারিত তথ্য তিনি তুলে ধরেননি।

গাজী নিয়াজুল করিম আরও দাবি করেন, সম্প্রতি একই ধরনের ঘটনায় শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের সাজা কার্যকরের পরিস্থিতিতে দেশটির দূতাবাস উদ্যোগ নিয়েছিল এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিচারপ্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন
গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিনও নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় অসন্তোষ জানিয়েছেন। তাদের মতে, সৌদি আরবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ায়ও মানবিক বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ থাকা উচিত। তারা মনে করেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

তারা বাংলাদেশের ও সৌদি আরবের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করতে।

এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। নজরুলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, বিচারকালে তার পক্ষে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, বাংলাদেশ দূতাবাস তার মামলা সম্পর্কে আগে অবগত ছিল কি না এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।

এসব তথ্য ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়া বা দূতাবাসের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। তবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ার অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

মরদেহ দেশে এলে সহায়তার আশ্বাস
নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারকে সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি।

তিনি জানান, মরদেহ দেশে এলে নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

তবে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, কবে তা ফিরতে পারে এবং এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগের অগ্রগতি কী, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো বাবা এখন ছেলের মরদেহ ফেরার অপেক্ষায়। কিন্তু তার কাছে এখনো অজানা, কোন অভিযোগে ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় কী ঘটেছিল। পরিবারের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চিত করা, মরদেহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তার তথ্য প্রকাশ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *