সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

কানাডায় কাজ ও স্থায়ী বসবাসের আশ্বাস, বাংলাদেশি নারীকে যৌন নির্যাতন; দুই প্রবাসীর কারাদণ্ড

কানাডায় কাজ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশি এক নারী। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আশ্বাসই তার জন্য হয়ে ওঠে শোষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। কাজের অনুমতিপত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মজুরি না দেওয়া এবং পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগের পরিণতিতে কানাডার আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রবাসী।

গত ২২ অক্টোবর কানাডার সাসকাচুয়ান প্রদেশের সাসকাটুনের প্রাদেশিক আদালত মোহাম্মদ মাসুম (৪৫) ও সোহেল হায়দারকে (৫৬) কারাদণ্ড দেন। কানাডীয় সংবাদমাধ্যম সিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানব পাচার ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মাসুমকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মানব পাচারের দায়ে হায়দারকে সাড়ে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক মিগুয়েল মার্টিনেজ।

চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের আশ্বাসে কানাডা যাত্রা
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নারী বাংলাদেশে প্রায় ১৮ বছর সরকারি চাকরি করেছেন। পরে কানাডায় রেস্তোরাঁয় কাজ এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার আশায় দেশটিতে যান।

২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি সাসকাচুয়ানের গাল লেকে হায়দারের এবং টিসডেলে মাসুমের রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। কিন্তু বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও তাকে কাজের অনুমতিপত্র দিতে পারেননি তারা।

অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, ওই নারীকে নিয়মিত ও যথাযথ মজুরি দেওয়া হতো না। সপ্তাহে ছয় দিন দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা হতো তাকে। একপর্যায়ে মাসুম তার পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেন। এ সময় ওই নারী একাধিকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

অন্য রেস্তোরাঁয় কাজের অনুমতিপত্র, এরপর আদালতে অভিযোগ
পরিস্থিতির মধ্যে ওই নারী কানাডার এলরোজ এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কাজের অনুমতিপত্র সংগ্রহ করেন। তার দুরবস্থার কথা জানতে পেরে কয়েকজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সহায়তায় তিনি আদালতে অভিযোগ করেন।

বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মাসুম ও হায়দারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়। আদালত মাসুমের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও যৌন নির্যাতনের তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। হায়দারকে মানব পাচারের দায়ে সাড়ে চার বছরের সাজা দেওয়া হয়।

বিচারক মার্টিনেজ ভুক্তভোগীর প্রতি মাসুমের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে ধর্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আদালতের প্রকাশনা নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

‘তারা আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে’
আদালতে দেওয়া ভিকটিম ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্টে নিজের জীবনে নির্যাতনের প্রভাব তুলে ধরেছেন ওই নারী। সিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘আমি তাদের ভুলতে পারি না। তারা আমার স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছে। তারা আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। আমার সম্মান, আমার ভবিষ্যৎ, আমার পরিবার, আমার ক্যারিয়ার, সবকিছু শেষ করে দিয়েছে।’

সিবিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী এখনো আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মানুষের প্রতি তার বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই ঘটনায় একদিকে যেমন কানাডায় কাজ ও স্থায়ী বসবাসের আশ্বাসের আড়ালে একজন অভিবাসী নারীর শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে, অন্যদিকে আদালতের রায়ে দুই অভিযুক্তের অপরাধের দায়ও নির্ধারিত হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর পরবর্তী জীবন, ক্ষতিপূরণ কিংবা তার পুনর্বাসন নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে উল্লিখিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *