বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন সাগর আলী। ছয় মাসের মাথায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ঋণের সাড়ে ছয় লাখ টাকার মধ্যে এক লাখ টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। এরই মধ্যে বন্ধক রাখা হয়েছে পরিবারের একমাত্র বসতবাড়ি। স্বামীকে হারিয়ে এখন দুই সন্তান নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে সাগরের স্ত্রী পারভীন খাতুন।
একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত মজিদুল সরদারের মরদেহের অপেক্ষায় সপ্তাহে দুদিন প্রশাসনের কার্যালয়ে ছুটছেন তার ৭০ বছর বয়সী বাবা মজনু সরদার ও মা ছাইদা বেগম। তাদের অপেক্ষা কেবল সন্তানের মরদেহ দেশে ফেরার নয়, শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখারও।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর ১২ প্রবাসীর মধ্যে সাতজনের মরদেহ দেশে ফিরেছে গত ২৮ আগস্ট। কিন্তু বাকি পাঁচজনের মরদেহের অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি। তাদের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলায়, অন্যজনের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়।
পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার কাজ শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এরপরও মরদেহ ফেরার নির্দিষ্ট সময় জানতে পারছেন না স্বজনেরা। ফলে প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে তাদের প্রতিদিনের জীবনে যুক্ত হচ্ছে নতুন দুশ্চিন্তা, মরদেহ কবে ফিরবে, সংসার চলবে কীভাবে, আর বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণই বা শোধ হবে কী করে?
পরিচয় শনাক্তের পরও অপেক্ষা কেন?
মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় ঠিক কোন ধাপে বিলম্ব হচ্ছে, কবে নাগাদ অবশিষ্ট পাঁচজনের মরদেহ ফেরানো সম্ভব হবে, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা পাওয়া যায়নি।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে প্রশাসন।
তবে পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে অপেক্ষার অবসান। মজিদুলের বাবা-মা সপ্তাহে দুদিন ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে ছেলের মরদেহ ফেরার বিষয়ে খোঁজ নেন। বারবার একই প্রশ্ন নিয়ে তাদের সেখানে যেতে হচ্ছে, কবে দেশে ফিরবে তাদের সন্তান?
ফোনে ছেলের ছবি, ঘুমহীন রাত
আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের পারুল আক্তারের কাছেও এখন ছেলের স্মৃতিই সম্বল। সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছেলে মিনহাজের ছবি মুঠোফোনে দেখলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সন্তান হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মরদেহ ফেরার অনিশ্চয়তা। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে কবে পাবেন, সেই চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে তার।
মজিদুলের বাবা-মা কিংবা মিনহাজের মায়ের মতো অপেক্ষায় থাকা অন্য পরিবারগুলোর জন্যও প্রতিটি দিন কাটছে উৎকণ্ঠায়। প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও শেষবারের মতো তাকে দেখতে না পারার কষ্ট তাদের শোককে আরও দীর্ঘ করছে।
বিদেশযাত্রার ঋণ এখন পরিবারের বোঝা
এই ট্র্যাজেডির আরেকটি দিক হলো, প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের ওপর নেমে আসা আর্থিক বিপর্যয়। বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাতে নেওয়া ঋণ অনেক পরিবারের জন্য এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামের সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুনের পরিস্থিতি তারই উদাহরণ। ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন সাগর। কিন্তু ঋণের এক লাখ টাকাও শোধ করতে পারেননি। পরিবারের একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতবাড়িও বন্ধক রাখা হয়েছে।
এখন স্বামীহারা পারভীনের সংসারে রয়েছে দুটি ছোট ছেলে। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সংসারের খরচ কীভাবে চলবে এবং ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর নেই তার কাছে।
এমন পরিস্থিতিতে নিহতদের পরিবারের দাবি, শুধু মরদেহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করলেই হবে না; যেসব পরিবার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছে, তাদের জন্যও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসনের আশ্বাস, পরিবারগুলোর অপেক্ষা
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিএনএ পরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে এবং মরদেহ ফেরানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস রয়েছে।
তবে পরিবারগুলোর সংকটের দুটি দিক, মরদেহ ফেরানোর সময়সীমা এবং ঋণ ও সংসার চালানোর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। প্রথমটির সমাধানের অপেক্ষায় স্বজনেরা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, আর দ্বিতীয়টির ভার বহন করতে হচ্ছে তাদের প্রতিদিনের জীবনে।
গত ২৮ আগস্ট ১২ জনের মধ্যে সাতজনের মরদেহ দেশে ফেরার পর বাকি পাঁচ পরিবারের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত মরদেহ ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্বজন হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তাও নিশ্চিত করা হবে।
এই পাঁচ পরিবারের সংকট তাই শুধু মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঋণ, জীবিকা ও পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।








