বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সবশেষ

ফেসবুকের একটি পোস্টও কি বাতিল করতে পারে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা?

অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পেতে এখন শুধু পাসপোর্ট, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথেষ্ট নাও হতে পারে। আবেদনকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী লিখছেন, কোন বক্তব্যে সমর্থন দিচ্ছেন, অতীতে কোনো উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কি না, এসব বিষয়ও প্রভাব ফেলতে পারে তার ভিসার ভাগ্যে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার বাইরে বসে প্রকাশ করা কোনো বক্তব্যও দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আসতে পারে।

ভিসা প্রত্যাখ্যান ও বাতিলের ক্ষেত্রে চরিত্র যাচাইয়ের নীতিমালায় এমনই বিস্তৃত পরিবর্তন এনেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। গত ৩১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন মিনিস্টেরিয়াল ডাইরেকশন ১২৩ (এমডি ১২৩)। এর মাধ্যমে আগের মিনিস্টেরিয়াল ডাইরেকশন ১১০ (এমডি ১১০) প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক।

নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, ব্যক্তির অনলাইন বক্তব্য ও প্রকাশ্য অবস্থানকে চরিত্র মূল্যায়নের আওতায় আনার সুযোগ। অর্থাৎ, কারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট শুধু ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বিবেচিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বক্তব্যের ধরন, তার প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্কও ভিসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।

কোন ধরনের পোস্ট বা বক্তব্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
নতুন নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সহিংসতাকে সমর্থনের মতো বিষয়গুলোতে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বর্ণ, গায়ের রং, জাতীয়তা কিংবা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন কি না, তা মূল্যায়ন করা হতে পারে।

অন্যের প্রকাশিত ঘৃণামূলক বক্তব্যে প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়া কিংবা বিদ্বেষমূলক মতাদর্শ প্রচারের বিষয়ও বিবেচনার বাইরে থাকবে না। শুধু নিজের লেখা বা পোস্ট নয়, প্রকাশ্যে অন্যের বক্তব্যকে সমর্থন করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বক্তব্যটি কোথা থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, তা মুখ্য নয়। কেউ বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বক্তব্য প্রকাশ করলেও তা অস্ট্রেলিয়ার চরিত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিবেচিত হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার মাইগ্রেশন অ্যাক্টের ৫০১ ধারায় চরিত্রগত যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির আচরণ এবং তাকে দেশটিতে প্রবেশ বা বসবাসের অনুমতি দিলে সমাজের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও কি ভিসা বাতিলের ঝুঁকি আছে?
নতুন নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চরিত্র মূল্যায়ন শুধু আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। সন্ত্রাসী সংগঠন, নিষিদ্ধ ঘৃণাভিত্তিক সংগঠন কিংবা সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদে সমর্থন জোগানো গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও বিবেচনায় আসতে পারে। একইভাবে হেট ক্রাইম বা বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া বা আদালতে দণ্ডিত হওয়াই সব ক্ষেত্রে একমাত্র শর্ত নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ, সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেও চরিত্র মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ কিংবা যেকোনো বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হবে। নতুন নির্দেশনায় মূলত নির্দিষ্ট ধরনের ঘৃণা, জাতিগত বিদ্বেষ, সহিংসতা ও সমাজের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত ব্যক্তির পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

শুধু অনলাইন বক্তব্য নয়, পারিবারিক সহিংসতাও নজরে
নতুন নীতিমালায় চরিত্র যাচাইয়ের পরিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। পারিবারিক ও গার্হস্থ্য সহিংসতার বিষয়েও আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ছবি বা উপাদান ব্যবহার করে হয়রানি, কাউকে অনুসরণ করা এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মতো আচরণও মূল্যায়নে আসবে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় শিশুদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

চরিত্র যাচাইয়ের পুরোনো কাঠামোতেও পরিবর্তন
এমডি ১২৩ শুধু নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করেনি, বরং ভিসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে, সেই কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছে।

আগের নির্দেশনায় অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিনের বসবাস, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগকে পাঁচটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়ের একটি হিসেবে রাখা হয়েছিল। নতুন নির্দেশনায় সেটিকে প্রধান তালিকা থেকে সরিয়ে অন্যান্য বিবেচনার পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।

এখন চরিত্র মূল্যায়নের চারটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো,
১. অপরাধ ও গুরুতর ক্ষতিকর আচরণ থেকে অস্ট্রেলীয় সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া।
২. পারিবারিক ও গার্হস্থ্য সহিংসতার বিষয়টি বিবেচনা করা।
৩. অস্ট্রেলীয় সমাজের প্রত্যাশা ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া।
৪. অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করা।

অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তির ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের ফলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কর্মক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটি আগের মতো আলাদা প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রাখা হয়নি।

কারা পড়বেন নতুন নিয়মের আওতায়?
নতুন নির্দেশনাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক তাদের জন্য, যাদের বিরুদ্ধে চরিত্রগত কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কিংবা এমন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত ভিসাধারী এবং দেশটিতে প্রবেশের আবেদনকারী, দুই পক্ষই রয়েছেন।

তবে নতুন নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, অস্ট্রেলিয়ার ভিসার জন্য আবেদন করলেই প্রত্যেকের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নিয়মিত পরীক্ষা করা হবে।

মূলত মাইগ্রেশন অ্যাক্টের ৫০১ ও ৫০১সিএ ধারার অধীনে চরিত্রগত কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যান, বাতিল এবং বাধ্যতামূলক বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন, সেটিই নির্ধারণ করেছে এমডি ১২৩।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *