বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

চীনের নতুন সাবমেরিনে পাকিস্তানের নজর ভারত মহাসাগরে, বদলাচ্ছে কি দক্ষিণ এশিয়ার নৌ-সমীকরণ?

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে আবারও নিজেদের পানির নিচের উপস্থিতি জোরদারের পথে হাঁটছে পাকিস্তান। চীনের তৈরি নতুন প্রজন্মের ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ অ্যাটাক সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত হওয়ায় ইসলামাবাদ মনে করছে, সমুদ্রে তাদের কৌশলগত সক্ষমতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের দীর্ঘদিনের নৌ-আধিপত্যকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলে না দিলেও সামরিক পরিকল্পনায় নতুন হিসাব যোগ করবে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের ‘পিএনএস গাজি’ বঙ্গোপসাগরে ধ্বংস হওয়ার পর দেশটি আর এই অঞ্চলে কার্যকর সাবমেরিন উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে গত এপ্রিলে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়া ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’কে ইসলামাবাদ প্রতীকী ও কৌশলগত দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছে। গত ১১ জুন সাবমেরিনটি করাচি বন্দরে পৌঁছালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে স্বাগত জানানো হয়।

চীনের কাছ থেকে একই ধরনের মোট আটটি সাবমেরিন সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে পাকিস্তানের। এর মধ্যে চারটি চীনে এবং বাকি চারটি প্রযুক্তি হস্তান্তরের আওতায় পাকিস্তানে নির্মিত হবে। নৌ-বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পুরো বহর প্রস্তুত হতে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

নতুন সাবমেরিনবহরের মিশন কমান্ডার কমোডর ওমর ফারুকের মতে, হ্যাঙ্গর সিরিজের সাবমেরিন পাকিস্তানের নৌ-অভিযানের পরিধি নিজস্ব জলসীমার বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করবে। তার ভাষায়, এটি এমন একটি সক্ষমতা, যা ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে নৌ-কৌশলের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

৭৬ মিটার দীর্ঘ ও ৮ দশমিক ৪ মিটার প্রস্থের কালো রঙের এই সাবমেরিনে রয়েছে ‘এয়ার ইনডিপেনডেন্ট প্রোপালশন’ (এআইপি) প্রযুক্তি। এর ফলে এটি টানা কয়েক সপ্তাহ পানির নিচে অবস্থান করতে পারে। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে অভিযান চালানোর এই সক্ষমতা সাবমেরিনটির গোপন চলাচল বা স্টিলথ ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি চীনের হাইনান প্রদেশের সানিয়ায় সাবমেরিনটি গ্রহণ করেন। সে সময় তিনি বলেন, নতুন সাবমেরিনগুলো আধুনিক অস্ত্র ও উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থায় সজ্জিত থাকবে এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। এই বহর যুক্ত হলে পাকিস্তান ধীরে ধীরে তাদের পুরোনো ফরাসি নির্মিত অ্যাগোস্টা শ্রেণির সাবমেরিনগুলো অবসরে পাঠাতে পারবে।

যদিও সংখ্যার বিচারে ভারত এখনো স্পষ্টভাবে এগিয়ে। দেশটির বহরে বর্তমানে ১৯টি সাবমেরিন রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি পারমাণবিক শক্তিচালিত। আরও ছয়টি নতুন সাবমেরিন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে পাকিস্তানের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রযুদ্ধে কেবল সংখ্যাই শেষ কথা নয়; একটি আধুনিক ও অদৃশ্য সাবমেরিনও প্রতিপক্ষের পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ ফয়সাল আলী শাহ বলেন, গত বছরের ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। তার দাবি, চার দিনের সংঘাতের সময় ভারতীয় নৌবাহিনী করাচি থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করলেও আর সামনে অগ্রসর হয়নি। তার মতে, ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতে নতুন হ্যাঙ্গর বহর পাকিস্তানের পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।

ফয়সাল আলী শাহ আরও বলেন, বঙ্গোপসাগর, হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর ও এডেন উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে উপস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও নতুন সাবমেরিনগুলো পাকিস্তানকে বাড়তি সুবিধা দেবে। তার যুক্তি, সমুদ্রে একটি সাবমেরিনের অবস্থান নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় মাত্র একটি আধুনিক সাবমেরিনও প্রতিপক্ষের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা গবেষণা ফেলো দিনাকর পেরি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, পাকিস্তানের নতুন সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে, তবে সামগ্রিকভাবে ভারতের নৌক্ষমতা এখনো অনেক বিস্তৃত। বর্তমানে পাকিস্তানের হাতে তিনটি অ্যাগোস্টা সাবমেরিন থাকলেও ভারতের বহরে রয়েছে ১৬টি প্রচলিত সাবমেরিন, যদিও সেগুলোর অনেকগুলোই পুরোনো।

দিনাকরের মতে, গত বছরের ‘অপারেশন সিন্দুরের’ সময় পাকিস্তান নৌবাহিনী মূলত নিজেদের উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। তবে নতুন সাবমেরিন যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে এবং ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাবিদদের নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের এই আধুনিকায়ন চীনের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তার মূল্যায়নে, চীন পাকিস্তানকে আধুনিক অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে, যদিও ভারতবিরোধী সম্ভাব্য কোনো সামুদ্রিক সংঘাতে সরাসরি অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

দিনাকর পেরির মতে, ভারতের জন্য আরও বড় উদ্বেগ চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত নৌবাহিনী। পাশাপাশি ভারত যখনই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, তখন সংশ্লিষ্ট এলাকায় চীনা গবেষণা জাহাজের উপস্থিতিও নয়াদিল্লির নজরে থাকে।

অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে ফয়সাল আলী শাহ বলেন, ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা জোট ‘অকাসের’মতো বহিরাগত উদ্যোগও এ অঞ্চলে নতুন সামরিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে। ২০২১ সালে গঠিত এই জোটের আওতায় পারমাণবিক শক্তিচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন ও অন্যান্য উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ চলছে।

তবে দিনাকর পেরির মূল্যায়ন, সামগ্রিক নৌশক্তির দিক থেকে ভারতের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। বিশেষ করে পি-৮আই দূরপাল্লার নজরদারি বিমান এবং এমএইচ-৬০আর বহুমুখী হেলিকপ্টার ভারতের সাবমেরিনবিরোধী সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, ভারতের প্রচলিত সাবমেরিনবহর পুরোনো হয়ে যাওয়ায় এবং আধুনিকায়ন ধীরগতির হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে পাকিস্তানের নতুন সংযোজন ভারতীয় নৌপরিকল্পনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

তার ভাষায়, পাকিস্তানের নতুন হ্যাঙ্গর বহর আরব সাগরে প্রতিপক্ষের চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা এই পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনায় নেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *