চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের গ্রেপ্তার। রোববার (৯ আগস্ট) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে সিআইডির একটি দল তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
আদালতের প্রসিকিউশন সূত্রে গ্রেপ্তারের তথ্য জানা গেছে। ইমিগ্রেশন সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দর এলাকায় ডনকে আটক করার পর খবর দেওয়া হলে সিআইডির কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে তাকে নিয়ে যান। সালমান শাহ হত্যা নিয়ে সিআইডিতে একটি মামলা চলমান রয়েছে এবং সেটির তদন্তও চলছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। তার মৃত্যুর পর বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে শুরু থেকেই ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা আত্মহত্যা নয়, হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করেন তিনি।
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন সালমানের বাবা। একই সঙ্গে অপমৃত্যুর মামলা ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।
তদন্ত শেষে ওই বছরের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইডি। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন। তবে এতে সন্তুষ্ট না হয়ে সালমানের বাবা রিভিশন মামলা করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরদিন, ২১ অক্টোবর, সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমানের স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে সালমান শাহর মৃত্যুর দিনের ঘটনাপ্রবাহও উল্লেখ করা হয়েছে। বাদী মোহাম্মদ আলমগীরের দাবি, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), ভগ্নিপতি কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে তাদের জানানো হয়, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। এরপর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাসায় ফিরে শয়নকক্ষে তাকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। এ সময় কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসেছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বাদীর অভিযোগ, পথে সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায়। প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলায় আসামিদের মধ্যে সামীরা হক ছাড়াও রয়েছেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, আশরাফুল হক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে মামলার তদন্তে সালমান শাহর মরদেহের দেহাবশেষ উত্তোলন ও নতুন করে ময়নাতদন্তের বিষয়টিও সামনে এসেছে। হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গত ২০ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৪ মে মরদেহ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করলে আদালত সেটি নথিভুক্ত করেন।
পরে ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপিও আদালতে দাখিল করে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
সালমান শাহ হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে। এর মধ্যেই ডনের গ্রেপ্তার মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মামলার অভিযোগে অভিযুক্তদের কেউ মারা গিয়ে থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে বাদীপক্ষ জানিয়েছে।








