জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় একই লক্ষ্য নিয়ে রাজপথে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুই বছরের ব্যবধানে স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পারস্পরিক আস্থার জায়গায় এসেছে প্রকাশ্য সমালোচনা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক অবস্থানের সংঘাত। প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলই এই বাস্তবতা স্বীকার করেছে, যদিও বিভেদের কারণ নিয়ে তাদের ব্যাখ্যা ভিন্ন।
জামায়াতে ইসলামী এই দূরত্বের জন্য সরাসরি বিএনপিকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, ক্ষমতা ও মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতিতে বিভাজন স্বাভাবিক। আর বিএনপির মতে, বিরোধী দলের সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ হলেও তা জোরজবরদস্তির পর্যায়ে গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরাজিত শক্তি ফিরে আসার সুযোগ পাবে।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিরোধী দল সংসদের বাইরে বলছে ৫ বছর করতে দেবে না। এ ধরনের কথা বলতেন হাসিনা।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ৭০ শতাংশ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে জুলাই বাস্তবায়নের আন্দোলন চালিয়ে যাবে।’
অন্যদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলন আসছে, সেটা জনগণের আন্দোলন।’
মাত্র দুই বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শ্রমিক-জনতার পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দাবিতে একক কাতারে ছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেই ঐক্যে ধীরে ধীরে ভাঙন দেখা দেয়। শুরুতে সীমিত পরিসরের মতপার্থক্য থাকলেও এখন তা প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো একই অবস্থানে ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি অবস্থান পরিবর্তন করায় বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তার ভাষায়, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকায় আসতেই স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল সুস্পষ্ট আদর্শিক রূপরেখা উপস্থাপন করতে পারেনি। তার মতে, বর্তমান বিভাজনের মূল কারণ দুটি—ক্ষমতার রাজনীতি এবং মতাদর্শগত পার্থক্য। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থে দরকষাকষির অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান আলাদা থাকাই স্বাভাবিক। বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে এবং কর্মসূচিও দেবে, তবে সবকিছু গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত। তার মতে, কেউ যদি এককভাবে নিজের অবস্থান চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হবে এবং পরাজিত শক্তি সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
বিএনপির দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করলেও সরকার সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।








