দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পকারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখাকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে বা দেশের শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায়, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে ত্রাণ এবং নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করে কারখানা স্থাপন করতে হবে। তবে এ জন্য প্রথম শর্ত হচ্ছে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকা। বিশৃঙ্খল পরিবেশে বিনিয়োগকারীরা শিল্পকারখানা পরিচালনা করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা চাইবেন তাদের কারখানার উৎপাদিত পণ্য নির্বিঘ্নে বন্দরে পৌঁছাবে এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালও সময়মতো দেশে আসবে। সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থায়ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রয়োজন। কারখানা ঠিকভাবে পরিচালিত না হলে কর্মসংস্থানও তৈরি করা সম্ভব হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’ একই সঙ্গে বিভ্রান্তকারীরা যেন কোনো সুযোগ না পায়, সে বিষয়েও জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নেও স্থিতিশীল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, স্কুল-কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের নতুন বই দেওয়ার মতো কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে হবে।
বিভ্রান্তকারীদের বিষয়ে সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ পেলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ যারা বিভ্রান্ত করে, তারা নিজেদের মতো করে চলে যাবে; কিন্তু জনগণের সঙ্গে তাদের থাকতে হবে না।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে, নাকি মানুষ ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে থাকবে কিংবা বিভ্রান্তকারীদের সঙ্গে থাকবে—এ বিষয়ে দেশের মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর এক মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছিল এবং তা শেষ হয়েছে। এ বছর দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের মায়ের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়া হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তারেক রহমান বলেন, এর মাধ্যমে পরিবারের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। সন্তানদের পড়াশোনা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়েও যাতে মায়েরা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর কথাও জানান তিনি।
সমুদ্রসম্পদ ও উপকূলীয় অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প ও কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
এর আগে, রোববার সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টার কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে পৌঁছায়। সেখানে হেলিপ্যাডে তাকে অভ্যর্থনা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এর আগে, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৯টার দিকে হেলিকপ্টারে মাতারবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
বাঁশখালীর বাহারছড়ায় প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে ১০০টি অসচ্ছল পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিটি ঘরের দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট। এতে দুটি কক্ষ এবং পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুটের একটি সংযুক্ত শৌচাগার রয়েছে। উপকূলীয় এলাকার দুর্যোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ঘরগুলোতে আরসিসি পিলার, কাঠ ও টিন ব্যবহার করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শিশুকে আর্থিক সহায়তার চেক দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বেলা ২টায় ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তিনি। বিকেল সোয়া ৩টায় হাটহাজারীর আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করার কথা রয়েছে।
এরপর বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে হাটহাজারী ডাকবাংলোয় যাত্রাবিরতি নেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল ৫টায় হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি।
সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউ হোটেলের মিলনায়তনে সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। কর্মসূচি শেষে রাত সাড়ে ৯টায় হজরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার।








